সেরহি ক্রিনিতস্কি দেখছিলেন, কীভাবে তাঁর জীবনের একমাত্র সঙ্গীটি ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে—যে মানুষটি তাঁর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল যুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় জীবন।
প্রায় এক বছর ধরে সম্মুখসারির একটি পরিখায় তাঁরা দুজন একসঙ্গে বেঁচে ছিলেন। রুশ সেনাদের সঙ্গে লড়াই করেছেন, নিহতদের কাছ থেকে খাবার সংগ্রহ করেছেন। চারপাশের ভয়াবহতার মধ্যেও কখনো ঝগড়া করেছেন, কখনো আবার একসঙ্গে হেসেছেন।
কিন্তু এবার ক্রিনিতস্কি একা।
ইউক্রেনীয় এই সেনা তাঁর মোবাইল ফোনের ক্যামেরা তাক করলেন সঙ্গীর নিথর দেহের দিকে। ছোট্ট সেই মাটির বাংকারের ভেতর দেহটি আটকে ছিল। রক্তে ভেজা একটি পা বাইরে বেরিয়ে ছিল। ড্রোন থেকে ফেলা বোমার বিস্ফোরণে ছিটকে আসা ধাতব টুকরায় তাঁর একটি ধমনী কেটে গিয়েছিল। অবিরাম রক্তক্ষরণে শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।
৪২ বছর বয়সী ক্রিনিতস্কি ক্লান্ত ও নির্বিকার মুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সকালে একসঙ্গে বসে হাসি-ঠাট্টা করছ, আর সন্ধ্যা নামার আগেই মনে হচ্ছে স্বর্গের দরজা ডাকছে।”
তখন যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁদের অবস্থানের ৩২৬তম দিন।
ড্রোন যুদ্ধের ব্যাপক বিস্তারই মূলত এমন বিচ্ছিন্ন অবস্থানের জন্ম দিয়েছে। এই প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রের চিরাচরিত কৌশল বদলে দিয়েছে। দীর্ঘ সম্মুখসীমার তুলনামূলক সংকীর্ণ এলাকায় বিপুলসংখ্যক সেনা, কামান ও সাঁজোয়া যান একত্র করে রাখার পুরোনো কৌশল এখন উভয় পক্ষকেই প্রায় পরিত্যাগ করতে হয়েছে। কারণ আকাশে উড়তে থাকা তুলনামূলক সস্তা চালকবিহীন ড্রোনের কাছে এ ধরনের দৃশ্যমান লক্ষ্যবস্তু খুব সহজেই ধরা পড়ে।
এর পরিবর্তে এখন দুই পক্ষই ছোট ছোট দলে সেনা মোতায়েন করছে। কখনো মাত্র দুই-তিনজনের দল। যুদ্ধক্ষেত্রের প্রায় ৩০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত একটি এলাকায় মাটির নিচে খোঁড়া ছোট ছোট পরিখা বা বাংকারে তারা ছড়িয়ে থাকে। ড্রোন হামলার অব্যাহত হুমকির কারণে এই এলাকাকে বলা হয় ‘কিল জোন’—মৃত্যু অঞ্চল।
এই ছোট দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য হলো শত্রুর নজর এড়িয়ে চলা এবং তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বল জায়গা দিয়ে ঢুকে পড়া। সামান্য কিছু ভূখণ্ড দখলের জন্যও তাদের অনেক সময় ভয়াবহ ঝুঁকি নিতে হয়। আর অবস্থান পরিবর্তন করাও অত্যন্ত বিপজ্জনক হওয়ায় তারা প্রায়ই মাসের পর মাস একই জায়গায় আটকে থাকে।
ক্রিনিতস্কি ও তাঁর ব্রিগেডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব ইউক্রেনের চাসিভ ইয়ার শহরের কাছে তাঁকে মোতায়েন রাখা হয়েছিল। পুরো সময়টিতে তিনি মোবাইল ফোনে একের পর এক ভিডিও ডায়েরি ধারণ করেন। কখনো কখনো রুশ ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার পর সেখান থেকে পাওয়া ব্যাটারি দিয়েই তাঁর ফোনে চার্জ দেওয়া হতো।
অশ্রাব্য গালাগাল ও তীব্র আবেগমিশ্রিত ভাষায় ধারণ করা এসব ভিডিওতে তিনি তুলে ধরেছেন মাত্র প্রায় ৩ বাই ৪ মিটার জায়গার একটি সংকীর্ণ বাংকারে বন্দি জীবন—যেখানে যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা, ভয়, ক্লান্তি আর কখনো কখনো অবিশ্বাস্য সব হাস্যকর পরিস্থিতি একই সঙ্গে উপস্থিত ছিল।
রয়টার্স তাঁর ইউনিটের সরবরাহ করা ২২টি ভিডিও পর্যালোচনা করেছে। তাঁর ইউনিট এসব ভিডিও বৃহত্তর দর্শকের সামনে ক্রিনিতস্কির গল্প তুলে ধরার উদ্দেশ্যে সরবরাহ করে। মোতায়েন শেষে রয়টার্স তাঁর সাক্ষাৎকারও নেয়। এসব ভিডিও ও সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সম্মুখসারিতে তাঁর ৩৪৬ দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর প্রায় পুরো সময়ই তিনি কাটিয়েছেন একটি পরিখায়। এই অসাধারণ দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ইউক্রেনের সর্বোচ্চ সামরিক পদকও লাভ করেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতার এক চক্রের মধ্য দিয়েই তাঁকে দিন কাটাতে হয়েছে। কয়েক দিন পরপরই দুই-তিনজনের ছোট ছোট দলে রুশ সেনারা পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসত। কখনো তারা ইউক্রেনীয় অবস্থানের মাত্র ২০ মিটারের কাছাকাছি চলে আসত। তখনই ইউক্রেনীয় সেনারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাত।
ক্রিনিতস্কির দাবি, দায়িত্ব পালনের সময় তিনি কাছ থেকে ২৩ জন শত্রু সেনাকে হত্যা করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম দিকের একজনের কথা তাঁর সবচেয়ে স্পষ্টভাবে মনে আছে। ওই রুশ সেনা গ্রেনেডের আঘাতে আহত হয়েছিল। একপর্যায়ে আত্মসমর্পণের ভান করে সে আবার ক্রিনিতস্কির দিকে রাইফেল তাক করে।
ক্রিনিতস্কি বলেন, “আমি প্রতিক্রিয়া দেখালাম। সে আমার দিকে আর নিশানা ধরে রাখতে পারেনি।”
নভেম্বরের ২৪ তারিখের একটি ভিডিওতে, দায়িত্ব পালনের ২০০ দিনেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর, একটি হামলা প্রতিহত করার পরের অদ্ভুত নীরব মুহূর্তে ক্রিনিতস্কি ক্যামেরা তাক করেন দুই শত্রু সেনার মরদেহের দিকে।
তিনি বলেন, “বোকা। যেখানে তাদের থাকার কথা নয়, সেখানেই হামাগুড়ি দিয়ে চলে এসেছিল।”
ক্রিনিতস্কির ইউনিট ২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেড নিশ্চিত করেছে যে তিনি ২৩ জন শত্রু সেনাকে হত্যার কথা রিপোর্ট করেছিলেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং উভয় পক্ষের সেনাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে মন্তব্য চেয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
সূত্র: রয়টার্স