রাশিয়া চলতি বছরের শেষ দিকে ইউক্রেন যুদ্ধে আরও অন্তত ৩ লাখ সেনা মোতায়েন করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। পূর্ব ইউক্রেনের একটি দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত অঞ্চল দখলের লক্ষ্যেই মস্কো নতুন করে সেনা সমাবেশ করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
রোববার (২৩ আগস্ট) প্রকাশিত এক বিস্তৃত বক্তব্যে জেলেনস্কি বলেন, বিপুল জনবল হারালেও বছরের শুরুতে ইউক্রেনের যে পরিমাণ ভূখণ্ড রাশিয়ার দখলে ছিল, বছরের শেষেও প্রায় একই পরিমাণ ভূখণ্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে।
জেলেনস্কির দাবি, চলতি বছর এখন পর্যন্ত রাশিয়া ২ লাখ ৬৭ হাজার সেনা হারিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার নিহত হয়েছেন। তবে এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন হিসাবের সঙ্গেও এ দাবির কিছুটা মিল রয়েছে।
আগামী মাসে রাশিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচন শেষে নতুন করে সেনা সমাবেশের ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলেনস্কি বলেন, এ সৈন্যযোজন বড় শহরগুলোতে না করে অন্য অঞ্চল থেকে করা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে মোতায়েন করা ৩ লাখ সেনাকে পূর্ব ইউক্রেনের পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবহার করবেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। জেলেনস্কির দাবি, বছরের শেষ নাগাদ দোনেৎস্ক দখলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন পুতিন।
বর্তমানে ইউক্রেনীয় বাহিনী দোনেৎস্কের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। এর মধ্যে স্লাভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী রয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার পক্ষে পুরো দোনেৎস্ক অঞ্চল দখল করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে খারকিভ ও সুমি অঞ্চলের উত্তরাঞ্চলেও রুশ বাহিনী নতুন করে অভিযান চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি। তিনি জানান, ২০২৩ সালে ইউক্রেনকে ৬৭৫টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হলেও চলতি বছর এর সংখ্যা ২৬৪-এ নেমে আসতে পারে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে প্যাট্রিয়টই ইউক্রেনের একমাত্র কার্যকর ব্যবস্থা বলে দাবি করেন তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ইউক্রেনকে সরবরাহ করে, তাহলে কিয়েভ এর মূল্য পরিশোধ করবে। এমন পদক্ষেপ জীবন রক্ষার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইউরোপ থেকে অ্যাস্টার আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট রয়েছে বলে জানান জেলেনস্কি। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র নেই বলে জানান তিনি।
এদিকে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আরও জোরদার হতে পারে। যুক্তরাজ্য ইউক্রেনকে নিজস্ব দূরপাল্লার স্ক্যাল্প ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করতে ব্রিটিশ উপাদানসংক্রান্ত গোপন তথ্য প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এমবিডিএকে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
জেলেনস্কি জানান, রাশিয়া বছরে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের স্থানগুলো শনাক্ত করে সেগুলোতে হামলার পরিকল্পনাও করছে ইউক্রেন।
এ ছাড়া রাশিয়ার ভূখণ্ডের স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহারের জন্য স্টারলিংকের অনুমতি পাওয়ার বিষয়েও ইউক্রেন কাজ করছে। জেলেনস্কির দাবি, স্টারলিংকের মালিক ইলন মাস্ক আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের অনুমতি দিলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় জটিলতা
যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন জেলেনস্কি। আগামী গ্রীষ্মের শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার রাশিয়াকে এমন কোনো সমঝোতায় রাজি করানোর পথ খুঁজে পাচ্ছেন না, যাতে ইউক্রেনকে দনবাস থেকে সরে যেতে বা অন্য কোনো অগ্রহণযোগ্য শর্ত মেনে নিতে না হয়।
জেলেনস্কি জানান, যুদ্ধ বন্ধের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনাগুলো এক পৃষ্ঠায় তুলে ধরার বিষয়ে উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। এসব বিকল্প নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন ও রাশিয়ার সঙ্গে পরবর্তী আলোচনা করতে চায়।