নেপালে আকস্মিক বন্যা-ভূমিধসের কারণ কী

হিমালয়ের উঁচুতে একটি বিশাল হিমবাহ ধসে পড়ার পর নেপাল ও চীনশাসিত তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া দুই দেশ মিলে প্রায় ১,৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮০০ জনেরও বেশি বিদেশি পর্যটক।

দুর্ঘটনাটি যেভাবে ঘটলো

বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য অঞ্চলে প্রলয়ঙ্কারী এই প্লাবন আঘাত হানে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ধসে প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। পতনের সময় এটি প্রচুর পাথর ও পলি টেনে আনে।

এই বরফ-পাথরের ধসটি তিব্বতের লেন্দে নদীতে পড়ে একটি অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করে। পরবর্তীতে সেই বাঁধ ভেঙে প্রচণ্ড বেগে কাদা, পাথর ও পানি নিচের দিকে নেমে আসে। প্লাবনের তোড়ে লেন্দে নদী, ভোটে কোশী ও ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এতে ১৯টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক পুরোপুরি ভেসে যায়।

প্রাথমিকভাবে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পকে এর কারণ মনে করা হলেও, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (USGS) জানায়, বিশাল ধসের বিকট কম্পনের কারণেই মূলত এই ভূকম্পীয় তরঙ্গ তৈরি হয়েছিল।

ক্ষয়ক্ষতি ও ভুক্তভোগীদের চিত্র

মৃত্যু ও নিখোঁজ: নেপালে ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন (যার মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি)। তিব্বতের জিরোং কাউন্টিতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৬০ জন বিদেিশসহ ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

বিদেশি নাগরিক: নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের ১৭৭, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৫ জন নাগরিক রয়েছেন। তাদের অনেকেই কৈলাশ মানস সরোবরগামী তীর্থযাত্রী ছিলেন।

আহত ও উদ্ধার: হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অন্তত ৬৫ জন। নেপালে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ৫ হাজারের বেশি সদস্য হেলিকপ্টার, ড্রোন ও স্নাইফার ডগ নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ভারত: ১০ টন জরুরি ত্রাণসামগ্রী (তাঁবু, কম্বল, ওষুধ) পাঠিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সঙ্গে কথা বলে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

জাতিসংঘ ও অন্যান্য: রেড ক্রিসেন্ট ১.২ মিলিয়ন ডলার জরুরি তহবিল বরাদ্দ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্যাটেলাইট ম্যাপিং ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জরুরি উদ্ধার দল ও আর্থিক সহায়তা পাঠাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা

বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট এই ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এখনও খতিয়ে দেখছেন। তবে ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দু কুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো পূর্বের দশকের তুলনায় ৬৫% দ্রুত গতিতে গলেছে। নেপালও গত তিন দশকে তার হিমবাহের এক-তৃতীয়াংশ আয়তন হারিয়েছে। অতিরিক্ত উষ্ণায়নের ফলে পাহাড়ি ঢাল অস্থির হয়ে এ ধরনের আকস্মিক ধস বাড়ছে।

সূত্র: আল-জাজিরা