যুক্তরাষ্ট্রকে খনিজ সম্পদে বিনিয়োগের আহ্বান তালেবান সরকারের

আফগানিস্তানের বিপুল খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে তালেবান সরকার। খনি, অবকাঠামো, কৃষি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কাবুল এমনটাই জানিয়েছেন তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি।

সোমবার (৩১ আগস্ট) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুত্তাকি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের সম্পর্ককে গত দুই দশকের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দিয়ে মূল্যায়ন না করে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনার ভিত্তিতে দেখা উচিত। তিনি জানান, আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক নীতি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় বা হোয়াইট হাউসে সরাসরি এই বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি মুত্তাকি।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা-সমর্থিত আফগান সরকারের পরিচালিত ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদের মজুত রয়েছে। দেশটিতে তামা, লৌহ আকরিক, নিওবিয়াম, কোবাল্ট, সোনা ও লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। দীর্ঘদিনের সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার কারণে এসব সম্পদের বড় অংশ এখনো বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর চীন, ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের খনি বিনিয়োগ চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে সোনা, মূল্যবান পাথর ও ক্রোমাইট উত্তোলন উল্লেখযোগ্য। ইস্পাত উৎপাদনে ক্রোমাইট গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর চেষ্টা

দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার পর গত এক বছরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে তালেবান সরকার। চীন, ভারত, ইরান, কাতার ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। গত বছর রাশিয়া তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। পরে মে মাসে দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।

জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রথমবারের মতো ব্রাসেলসে তালেবান কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে আফগান অভিবাসীদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। জার্মান কর্মকর্তারাও একই ধরনের আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

তালেবানের আশা, এসব কূটনৈতিক যোগাযোগ ভবিষ্যতে তাদের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ তৈরি করবে এবং বিদেশে আটকে থাকা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ দেশে ফেরানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

মুত্তাকি দাবি করেন, তালেবানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ এখনো দেশের বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র এর ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি ‘আফগান ফান্ডে’ স্থানান্তর করে। বর্তমানে সুদসহ ওই তহবিলের অর্থের পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

মুত্তাকি বলেন, আফগান জনগণের সম্পদ কোনো ব্যক্তি, সরকার বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়। বিদেশে থাকা এসব সম্পদ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কাবুল আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

বাগরাম ঘাঁটি ফেরত চেয়েছেন ট্রাম্প

তালেবানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর আগ্রহ থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত কাবুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখাননি। বরং কাবুলের উত্তরে অবস্থিত বাগরাম বিমানঘাঁটি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান। মুত্তাকি বলেন, বাগরামসহ আফগানিস্তানের সব সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা দেশটির জাতীয় সম্পদ।

একই সঙ্গে আফগানিস্তানে মার্কিন দূতাবাস পুনরায় চালুর জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মুত্তাকির দাবি, তালেবান দূতাবাসটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, আশপাশের সড়ক পুনর্নির্মাণ করেছে এবং সেখানে নতুন গাছ লাগিয়েছে।

মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ

তালেবান সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়লেও নারী ও মেয়েদের অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। তালেবান শরিয়াহ আইন কার্যকর করার পর নারী ও মেয়েদের শিক্ষা, ব্যবসা এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তার বিরুদ্ধে লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা চলতি মাসে সতর্ক করে বলেছেন, নারী ও মেয়েদের অধিকারসহ মানবাধিকার পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত তালেবানকে কার্যত কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়।

এদিকে, আফগানিস্তান এখনো বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশগুলোর একটি। দেশটির ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ—মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ—তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য।

তালেবান এখন বিদেশি বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সংকট কাটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের সেই প্রচেষ্টায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস