ভারতের মুম্বাই শহরের ব্যস্ত নগরজীবনের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে এমন কিছু পাথুরে নিদর্শন, যার বয়স প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর। এসব শিলার সঙ্গে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা-ডাইনোসরের বিলুপ্তির সময়কার বিশাল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের যোগসূত্র রয়েছে।
মুম্বাইয়ের আন্দেরি এলাকায় অবস্থিত গিলবার্ট হিল এমনই একটি ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে ডেকান অঞ্চলে সংঘটিত ব্যাপক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় লাভা জমাট বেঁধে এই ধরনের ব্যাসল্ট শিলা কাঠামো তৈরি হয়েছিল। গিলবার্ট হিল বর্তমানে মুম্বাইয়ের অন্যতম বিরল ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
এই শিলাগুলো যে সময়ের সাক্ষী, সেটি পৃথিবীর ইতিহাসের এক নাটকীয় অধ্যায়। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষে পৃথিবী থেকে ডাইনোসরসহ বিপুলসংখ্যক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়। একই সময় ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে চলছিল ডেকান ট্র্যাপসের ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত।
ডেকান ট্র্যাপস হলো পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আগ্নেয়গিরি অঞ্চল। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, এ অঞ্চলের অগ্ন্যুৎপাতের প্রধান পর্যায়টি ডাইনোসর বিলুপ্তির সময়ের খুব কাছাকাছি ঘটেছিল। বিপুল পরিমাণ লাভা ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি আগ্নেয়গিরি থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সালফারযুক্ত গ্যাস বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল। এর ফলে জলবায়ুতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
২০১৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ডেকান ট্র্যাপসের শিলায় থাকা জিরকন খনিজের বয়স নির্ধারণ করে দেখেছিলেন, এই বিশাল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়েছিল মেক্সিকোর চিকশুলুব অঞ্চলে গ্রহাণুর আঘাতের প্রায় আড়াই লাখ বছর আগে এবং এর প্রধান পর্যায়টি আঘাতের পরও কয়েক লাখ বছর অব্যাহত ছিল। ওই গবেষণায় বলা হয়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস নির্গত হয়ে বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগরের পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ডেকান আগ্নেয়গিরিই এককভাবে ডাইনোসর বিলুপ্তির কারণ ছিল। বর্তমানে অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে সংঘটিত বিশাল গ্রহাণুর আঘাতকে বিলুপ্তির প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই আঘাতে বিপুল পরিমাণ ধূলিকণা ও অন্যান্য পদার্থ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে সূর্যের আলো কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে বৈশ্বিক পরিবেশে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে।
একই সঙ্গে কিছু গবেষণা বলছে, গ্রহাণুর আঘাত এবং ডেকান আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত একে অপরকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। অর্থাৎ, ডাইনোসরদের জন্য এটি ছিল এক ধরনের ‘দুই দিকের আঘাত’- একদিকে মহাজাগতিক সংঘর্ষ, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ। তবে কোন প্রক্রিয়া কতটা ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো আলোচনা চলছে।
মুম্বাইয়ের গিলবার্ট হিল তাই শুধু একটি পাথুরে পাহাড় নয়। এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক অতীতের একটি দৃশ্যমান স্মারক। কোটি কোটি বছরের ক্ষয়, ভূ-গঠন ও নগরায়ণের মধ্যেও এই শিলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আজকের মুম্বাই যখন ছিল না, তখন এই অঞ্চলে চলছিল পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত।
শহরের আধুনিক স্থাপত্যের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন শিলা তাই ডাইনোসরের যুগের সঙ্গে বর্তমান পৃথিবীর একটি অনন্য সেতুবন্ধন। মুম্বাইয়ের পাথরের স্তরগুলোতে আজও যেন সংরক্ষিত আছে সেই সময়ের গল্প- যে সময় পৃথিবীর জলবায়ু বদলাচ্ছিল, আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাত করছিল এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর জীবজগতের ইতিহাসে ঘটে যায় এক মহাবিলুপ্তি।