নেপাল বন্যায় হারিয়ে যাওয়া এক শিশুর শেষ চিহ্ন ‘রোল নম্বর ৩১’ 

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা যতোই বাড়ছে, ততোই সামনে আসছে এই দুর্যোগের হৃদয়বিদারক মানবিক সব গল্প। সরকারি হিসাবের বিশাল সংখ্যার আড়ালে যে অসংখ্য ব্যক্তিগত জীবন, স্বপ্ন ও পরিবারের গল্প হারিয়ে যাচ্ছে, ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা এক স্কুলছাত্রের বই-খাতা যেন তারই নির্মম স্মারক হয়ে উঠেছে।

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাওয়া একটি স্কুলব্যাগে ছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রোশন মিজারের বই। বইয়ের পাতায় লেখা ছিল তার নাম- ‘রোশন মিজার’; রোল নম্বর- ৩১। সে শ্রী বাগেশ্বরী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বইয়ের ভেতরে একটি প্লাস্টিকের স্কেল দুই পাতার মাঝখানে আটকে ছিল। মনে হচ্ছে, কোনো এক সময় ক্লাসে শিক্ষক যেখানে পড়ানো শেষ করেছিলেন, সেখানেই স্কেলটি রেখে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাগের ভেতরে ছিল দুটি কলম এবং টিফিনের সময় খাওয়ার জন্য রাখা খাবার।

কিন্তু এরপর আর স্কুলে ফেরেনি সেই শিশু। বই, ব্যাগ ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পড়ে আছে; নেই শুধু বইয়ের মালিক। ভয়াবহ বন্যার স্রোত, কাদা ও পাথরের তোড়ে শিশুটির জীবন কোথায় হারিয়ে গেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই একটি স্কুলব্যাগই নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতাকে অন্যভাবে তুলে ধরছে। মৃতের সংখ্যা, নিখোঁজের সংখ্যা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর হিসাব দুর্যোগের ব্যাপকতা বোঝালেও, একটি শিশুর বই-খাতা তার চেয়েও গভীর এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় যে- প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং অপূর্ণ থেকে যাওয়া ভবিষ্যৎ।

সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে অন্তত ১ হাজার ২৫২ জন নিহত হয়েছেন এবং ৪ হাজার ২১৬ জন এখনো নিখোঁজ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও দুর্গম এলাকা, ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক ও সেতু এবং বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।

দুর্যোগে শুধু মানুষের জীবনই বিপর্যস্ত হয়নি; ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের অবকাঠামোও। নদী উপত্যকা, বসতি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ স্থাপনা বন্যার প্রবল স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক মূল্যায়নে ভোটেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরে প্রায় ২২ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ জমে থাকার কথা উঠে এসেছে।

তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও উদ্ধারকারীরা খুঁজে চলেছেন জীবিত মানুষ এবং নিখোঁজ স্বজনদের। রাজধানী কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে স্বজনেরা ছবি হাতে অপেক্ষা করছেন। কেউ নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি খুঁজছেন, কেউ উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় জানার চেষ্টা করছেন। বহু পরিবারের কাছে প্রিয়জনের কোনো একটি চিহ্নই এখন শেষ আশার অবলম্বন।

রোশনের বই-খাতা সেই অপেক্ষারই প্রতীক হয়ে উঠেছে। একটি স্কুলব্যাগ হয়তো তার মালিকের কাছে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু সেটি নেপালের এই দুর্যোগের ভয়াবহতার একটি স্থায়ী সাক্ষ্য হয়ে রয়ে গেছে। একটি রোল নম্বর- ৩১। কয়েকটি বই। দুটি কলম। বিরতির জন্য রাখা খাবার। আর একটি শিশুর নাম- রোশন মিজার।

দুর্যোগের সরকারি পরিসংখ্যানে হয়তো রোশন কেবল একজন নিখোঁজ মানুষ। কিন্তু তার বইয়ের পাতায় জমে থাকা কাদা মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি নিখোঁজের পেছনে ছিল একটি স্বপ্ন, একটি শ্রেণিকক্ষ, একজন শিক্ষক, সহপাঠীদের একটি দল এবং অপেক্ষায় থাকা একটি পরিবার।

নেপালের বন্যার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি তাই শুধু কতজন মারা গেলেন বা কতটি বাড়ি ধ্বংস হলো- তার হিসাব দিয়ে শেষ করা সম্ভব নয়। রোশনের স্কুলব্যাগের মতো ছোট ছোট স্মৃতিচিহ্নই বলে দিচ্ছে, এই দুর্যোগ আসলে কতগুলো অসমাপ্ত গল্প রেখে গেছে।