ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে: ট্রাম্প

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডালাসে শুরু হওয়া রিপাবলিকান পার্টির বিশেষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরেই প্রচারণার কৌশল সাজিয়েছে দলটি। তবে সম্মেলনের ওপর ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং এর কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপ।

রিপাবলিকানদের এই দুই দিনের সম্মেলনটি দলটির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বাজি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছর ছাড়া সাধারণত এ ধরনের জাতীয় দলীয় সম্মেলন হয় না। এবার ডালাসের সম্মেলনের মূল লক্ষ্য হলো ট্রাম্পকে সামনে রেখে রিপাবলিকান ভোটারদের উজ্জীবিত করা এবং নভেম্বরের নির্বাচনে দলটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইকে আরও জোরালো করা।

কিন্তু এই কৌশলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।

১০০ ডলারের ওপরে ব্রেন্ট

ডালাসে ট্রাম্প যখন সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বুধবার ব্রেন্টের দাম একপর্যায়ে ১০০ ডলারের ওপরে ওঠে এবং দিন শেষে প্রায় ১০১.২১ ডলারে স্থির হয়। জুলাইয়ের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক তেলের দাম ১০০ ডলার অতিক্রম করল।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং তেলবাহী জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিন ও ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের বড় পরীক্ষা

রিপাবলিকানদের জন্য সমস্যা হলো—মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও তার সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রভাব সরাসরি পড়ে। এবার ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরকে সামনে রেখে ভোটারদের কাছে দলের অবস্থান তুলে ধরতে হচ্ছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এবং মূল্যস্ফীতি সেই প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে।

ট্রাম্প অবশ্য নির্বাচনী রাজনীতিতে যুদ্ধের প্রভাবকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে।

তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুদ্ধ কখন শেষ হবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ফলে ট্রাম্পের নির্বাচনী সময়সূচিকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বাভাস কতটা বাস্তব সামরিক পরিকল্পনা আর কতটা রাজনৈতিক বার্তা—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

‘ট্রাম্প-কেন্দ্রিক’ সম্মেলন

রিপাবলিকানদের এই সম্মেলনকে ইতোমধ্যে ‘ট্রাম্পাপালুজা’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। দলের নেতারা মনে করছেন, ট্রাম্পই এখনো রিপাবলিকান ভোটারদের সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে মাঠে নামাতে পারেন। তবে দলের কিছু প্রার্থী ও আইনপ্রণেতা সম্মেলন থেকে দূরে থাকছেন—বিশেষ করে যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন। কারণ ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার রাজনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা ডালাসে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে। তাদের মূল বার্তা—রিপাবলিকানরা যখন ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে প্রচারণা সাজাচ্ছে, তখন ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হওয়া উচিত বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবা।

ফলে ডালাসের রিপাবলিকান সম্মেলন শুধু দলের ঐক্য প্রদর্শনের মঞ্চ নয়; এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতারও বড় পরীক্ষা। ইরান যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষ না হয় এবং তেলের দাম ১০০ ডলারের আশপাশে বা তার ওপরে থাকে, তাহলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।