ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ তুলে দেশটিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ভিয়েনায় সংস্থাটির ৩৫ সদস্যের বোর্ড অব গভর্নরস এ সিদ্ধান্ত নেয়। গত ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম ইরানকে এভাবে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে পাঠানো হলো।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির উত্থাপিত প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন ২৩টি দেশ। রাশিয়া, চীন ও নাইজার প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। আটটি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল এবং একটি দেশ ভোট দেয়নি।
কেন ইরানকে নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো হলো?
আইএইএর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের কয়েকটি অনঘোষিত স্থাপনায় ইউরেনিয়ামের চিহ্ন পাওয়ার ঘটনা। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে এসব চিহ্নের উৎস এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাইছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের সন্দেহ, এসব ইউরেনিয়াম চিহ্ন ইঙ্গিত করতে পারে যে ইরান ২০০৩ সাল পর্যন্ত গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকতে পারে। তবে ইরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো উদ্দেশ্য নেই।
২০২৫ সালের জুনে আইএইএ বোর্ড ইরানকে তার পারমাণবিক নিরাপত্তা চুক্তির অধীনে বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থ বলে ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকেই ইরানের সঙ্গে সংস্থাটির সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
পরমাণু স্থাপনায় হামলার পর পরিদর্শন বন্ধ
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেখানে আইএইএর পরিদর্শকরা আর প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের বর্তমান অবস্থা যাচাই করাও সংস্থাটির পক্ষে সম্ভব হয়নি।
আইএইএর হিসাবে, হামলার আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। এই মাত্রার সমৃদ্ধকরণ অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি হলেও ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজে থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র থাকার প্রমাণ নয়। তবে আইএইএ এটিকে গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছে।
তেহরানের পাল্টা অভিযোগ
নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। ভিয়েনায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি এটিকে একটি ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তার দাবি, আইএইএর এই সিদ্ধান্ত সংস্থাটির স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আস্থা নষ্ট করবে। ইরানের বক্তব্য, চলমান যুদ্ধ ও সামরিক হামলার মধ্যে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের নিরাপদে প্রবেশ করানো বাস্তবিকভাবেই সম্ভব নয়।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদিও অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে স্বাভাবিক পরিদর্শন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করেছে। পরে সেই বাধাকেই ইরানের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
নিরাপত্তা পরিষদে গেলেও নতুন নিষেধাজ্ঞা কি আসবে?
ইরানকে নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেশটির বিরুদ্ধে নতুন আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। এর ফলে নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ জব্দের মতো পদক্ষেপের বিষয় সামনে আসতে পারে।
তবে নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে না। কারণ রাশিয়া ও চীন উভয়ই পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। বুধবারের আইএইএ প্রস্তাবেও উভয় দেশ ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যেই নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা
ইরানকে নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত চলছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা, তেলবাহী জাহাজে হামলা এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ—সব মিলিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে আইএইএর সর্বশেষ সিদ্ধান্ত শুধু পারমাণবিক পরিদর্শন ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, নাকি এটি চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের নতুন কূটনৈতিক ফ্রন্ট খুলবে—সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
২০ বছর পর ইরানকে আবার নিরাপত্তা পরিষদের সামনে আনা তাই তেহরানের জন্য শুধু পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চাপ নয়; চলমান যুদ্ধের মধ্যেই এটি নতুন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপেরও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।