৯/১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়াম প্রায় সবকিছুই সংরক্ষণ করেছে। গ্রাউন্ড জিরোর প্রায় ৭০ ফুট নিচে রাখা হয়েছে আগুনে পুড়ে যাওয়া ফায়ার ট্রাক, দুমড়েমুচড়ে যাওয়া স্টিলের বিম, দমকলকর্মীদের হেলমেট, নিহতদের ঘড়ি এবং ছিনতাই হওয়া বিমানের যাত্রীদের রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতিগুলো।
দর্শনার্থীরা বিভিন্ন দিক থেকে টুইন টাওয়ারে বিমান আঘাত হানার দৃশ্য দেখতে পারেন। শুনতে পারেন ছিনতাই হওয়া বিমানে থাকা সেই মানুষগুলোর কণ্ঠ, যারা বুঝতে পেরেছিলেন—সম্ভবত তারা আর জীবিত ফিরতে পারবেন না।
নিউইয়র্ক, ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভানিয়ায় ২ হাজার ৯৭৭ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ২৫তম বার্ষিকীর আগে আমি জাদুঘরটি ঘুরে দেখলাম। উদ্দেশ্য ছিল, সেই দিনের কী গল্প এখানে বলা হচ্ছে এবং কোন বিষয়গুলো বাদ পড়ে যাচ্ছে, তা বোঝা।
সবচেয়ে সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা বয়ানেও এমন কিছু বিবরণ থাকে, যা নিঃশব্দে সেই বয়ানকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
৯/১১ একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। তাই জাদুঘরে গিয়ে চমকে দেওয়ার মতো কিছু দেখতে পাব—এমন প্রত্যাশা ছিল।
প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানে কাটিয়েছি। প্রদর্শনীগুলোর সামনে বারবার ঘুরেছি। দেখেছি, সেই ভয়াবহ দিনের ছবি ও ভিডিও সামনে আসতেই দর্শনার্থীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, বিস্ময়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকছেন, কেউ কেউ মুখে হাত চাপা দিচ্ছেন।
আমি মানুষের কথোপকথন শুনেছি, প্রদর্শিত বিভিন্ন নিদর্শনের পাশে লেখা বিবরণ মন দিয়ে পড়েছি। এরপর বসে ভেবেছি—আমাদের জীবনে ওই ঘটনার ব্যাপ্তি আসলে কতটা বিশাল। কিন্তু যে বিস্ময়ের অপেক্ষায় ছিলাম, তা আর আসেনি।
নিরলস সংগ্রহ
৯/১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়ামটি ২০১৪ সালের মে মাসে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বর্গফুট প্রদর্শনী এলাকা নিয়ে নির্মিত বিশাল এই জাদুঘরটি পুরোনো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কমপ্লেক্সের কাঠামোর মধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে। এর একটি অংশে ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত ভূগর্ভস্থ সেই দেয়ালও দৃশ্যমান রাখা হয়েছে, যা হাডসন নদীর পানি ঠেকিয়ে রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল।
জাদুঘরে ৯/১১-এর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে সংগৃহীত ৮৩ হাজারের বেশি নিদর্শন রয়েছে। বিমানের কর্মীদের কণ্ঠের রেকর্ড ও প্রতিলিপি, বিমানে থাকা স্বামীদের স্ত্রীদের উদ্দেশে পাঠানো শেষ বার্তা, টাওয়ারের জানালা দিয়ে মানুষ লাফিয়ে পড়ার মর্মান্তিক দৃশ্য, বিভিন্ন দিক থেকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টাওয়ারে বিমানের আঘাতের ছবি এবং নিউইয়র্কের আকাশ ঢেকে দেওয়া ধোঁয়ার দৃশ্য—সব মিলিয়ে দর্শনার্থীকে বারবার সেই দিনের ভয়াবহতার সামনে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
প্রধান হলজুড়ে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট প্রদর্শনী। কোথাও আমেরিকার পতাকার ঐক্যের প্রতীকী তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও টাচস্ক্রিনে দর্শনার্থীদের ভালোবাসা ও সমর্থনের বার্তা লেখার সুযোগ রাখা হয়েছে। আবার কাচের আলাদা একটি প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনের আস্তানার একটি ছোট মডেল।
আরও কৌতূহলোদ্দীপক একটি কাচের বাক্সে রাখা হয়েছে একটি ইট—দাবি করা হয়েছে, ২০১১ সালের মে মাসে মার্কিন নেভি সিলের অভিযানের পর সেটি বিন লাদেনের কমপ্লেক্স থেকেই আনা হয়েছিল।
যে অভিযানে বিন লাদেন নিহত হন, সেই অভিযানে তাঁর সাংকেতিক নাম ছিল ‘জেরোনিমো’—জাদুঘরটি সেটিও দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয়।
দর্শনার্থীদের যেন এক অন্তহীন চক্রের মধ্যে পাঠানো হয়—বারবার ফিরে যেতে হয় সেই দিনের আতঙ্কে। আর সবসময় ঘটনাগুলোকে ধারাবাহিক কালানুক্রমে উপস্থাপনও করা হয়নি।
বারবার ফিরে আসে সেই আতঙ্ক
‘হিস্টোরিক্যাল এক্সিবিশন’ সম্ভবত জাদুঘরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী। সেখানে দর্শনার্থী একই ভয়াবহতার মুখোমুখি হন একাধিকবার। এই পুনরাবৃত্তি এমন এক অনুভূতি তৈরি করে, যেন ৯/১১ এখনো ঘটছে—এই মুহূর্তেই ঘটছে।
প্রদর্শনীটি একসময় শ্বাসরুদ্ধকর মনে হয়। পথের কিছু অংশ সরু, চারপাশ থেকে ভেসে আসে শব্দ, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একের পর এক ছবি।
দার্শনিক রস পুল লিখেছেন, ৯/১১-এর ধাক্কা যেন চিরকাল বর্তমান হয়ে থাকে। দর্শনার্থীকে সেই দিনের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার করা হয়—ফলে আমরা তাদের মতোই অজ্ঞ অবস্থায় দাঁড়িয়ে যাই; যারা তখন জানতেন না কী ঘটছে, কেউ বাঁচার চেষ্টা করছিলেন, কেউ অন্যকে বাঁচাতে ছুটছিলেন, আবার কেউ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
জাদুঘরটি শুধু ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাই তুলে ধরে না। ১৯৯৩ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে চালানো হামলার কথাও বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে টুইন টাওয়ারকে আমেরিকান ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে—যে প্রতীকটি মার্কিন জনগণের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাদের শত্রুরা ধ্বংস করে।
কিন্তু সেই ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বিশ্বজুড়ে এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি খুব সামান্যই জায়গা পেয়েছে। যারা এই জাদুঘরে এসে জানতে চাইবেন—কেন এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল—তারা সম্ভবত ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতার একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং বিতর্কযোগ্য সংস্করণ নিয়েই বের হবেন।
‘সন্ত্রাসীদের’ অর্থায়ন
১১ সেপ্টেম্বরের হামলার বর্ণনায় জাদুঘর বলছে, হামলাটি চালিয়েছিল ‘আল-কায়েদা—একটি আন্তর্জাতিক ইসলামপন্থী উগ্র সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক’। সংগঠনটি ১৯৮০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাদের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের এমন সরকার উৎখাত করা, যারা তাদের ভাষায় ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা কঠোরভাবে প্রয়োগ করত না।
জাদুঘরের বর্ণনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার উদ্দেশ্য ছিল এসব সরকারের প্রতি আমেরিকার সমর্থন কমিয়ে দেওয়া। আল-কায়েদা মনে করত, মুসলিম বিশ্বে ইসলামী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথে মার্কিন সমর্থন ছিল বড় বাধা।
কিন্তু ৯/১১-এর ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তার তুলনায় এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাগুলো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং অস্পষ্ট।
জাদুঘরের একটি ক্যাপশনে বলা হয়েছে, স্নায়ুযুদ্ধের সময়—সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে—যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে আফগান বিদ্রোহীদের সমর্থন করেছিল। সিআইএ আফগানদের নিয়োগের জন্য অর্থ দিয়েছিল, তবে বিদেশি যোদ্ধাদের সরাসরি অর্থায়ন করেনি।
সমালোচকের দৃষ্টিতে এই বর্ণনা এড়িয়ে যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ওয়াশিংটন কেন পাকিস্তানের মাধ্যমে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহের পথ বেছে নিয়েছিল এবং কীভাবে এর মাধ্যমে সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি আড়ালে রাখা হয়েছিল।
অর্থাৎ যে রাষ্ট্রীয় কৌশল ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, সেটিও পরবর্তী সময়ে সেই কৌশলের অংশ হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আফগান যুদ্ধ কীভাবে এমন একটি অবকাঠামো ও পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখান থেকে পরবর্তীতে আল-কায়েদার উত্থানের সুযোগ তৈরি হয়—জাদুঘরটি চাইলে সেই ইতিহাস বিশদভাবে বিশ্লেষণ করতে পারত।
কিন্তু তার বদলে আল-কায়েদার ধর্মীয় মতাদর্শকে তাদের সহিংসতার প্রধান ব্যাখ্যা হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে।
লেখকের সমালোচনা হলো, এভাবে উপস্থাপন করলে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিক ধারণা আরও শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ’
জাদুঘরে তথাকথিত ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ নিয়েও খুব অল্প আলোচনা রয়েছে।
৯/১১-এর হামলা ঘটেছিল ২০০১ সালের একটি নির্দিষ্ট সকালে। কিন্তু এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের শুরু করা যুদ্ধ চলেছে দুই দশকেরও বেশি সময়।
এই যুদ্ধ শুধু একটি দেশের সীমান্তে সীমাবদ্ধ ছিল না। আফগানিস্তান থেকে ইরাক, পরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।
লেখাটির দাবি অনুযায়ী, এসব যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট সংঘাতে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ নিহত এবং ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
কিন্তু ৯/১১ জাদুঘরের মূল বয়ানে সেই দীর্ঘ যুদ্ধ, তার মানবিক মূল্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত।
ফলে জাদুঘরটি ৯/১১-এর ভয়াবহতা ও আমেরিকান মানুষের শোককে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ধারণ করলেও, সেই ঘটনার পরবর্তী বৈশ্বিক ইতিহাসকে একই বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরে না।
এ কারণেই লেখকের প্রশ্ন—৯/১১-এর স্মৃতি কি শুধু আমেরিকার নিহতদের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সেই দিনের পর যে দীর্ঘ যুদ্ধ ও বিপুল মানবিক বিপর্যয় শুরু হয়েছিল, তাদের স্মৃতিও ইতিহাসের অংশ হবে?
সূত্র: মিডল ইস্ট আই, রিপোর্টার আজাদ ইসা