দুই যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্বের শীর্ষ উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকসের সম্মেলন আয়োজন করছে ভারত। সম্মেলন ঘিরে সাজ সাজ রব দিল্লিতে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ছবি সম্বলিত পোস্টার শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে টানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি অতিথিদের নিরাপত্তায় রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আরোপ করা হয়েছে সাময়িক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ।
ব্রিকসের ১১ সদস্যের এই সম্মেলনে ইতোমধ্যে দিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে জোটের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য, পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো—সম্মেলনের আলোচনায় এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বসবেন পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। দুই দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এসব আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও ছয় বছর পর ভারত সফরে এসেছেন। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে দীর্ঘ সময়ের শীতলতা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তা কাটতে শুরু করেছে। ওই সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন; চীনের নিহত সেনার সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি।
দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় বিমান যোগাযোগ, ভিসা ব্যবস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ধীরে ধীরে পুনরায় চালু হয়েছে। সম্মেলনের ফাঁকে মোদির সঙ্গে শির বৈঠক হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
কী থাকছে ব্রিকসের আলোচনায়?
ব্রিকস প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে। পশ্চিমা-প্রভাবিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই জোটের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে জোটের পরিধি বেড়েছে। বর্তমানে ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই ১১টি দেশ এর সদস্য।
২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। দেশটি সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি অংশীদার দেশ ও আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদেরও সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্মেলনে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা আরও জোরদার করার উপায় নিয়ে নেতারা মতবিনিময় করবেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আশা প্রকাশ করেছেন, দুই দিনের সম্মেলনে বৈশ্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক ও অর্থবহ আলোচনা হবে।
কারা থাকছেন সম্মেলনে?
পুতিন, শি ও পেজেশকিয়ান ছাড়াও বিভিন্ন সদস্য ও অংশীদার দেশের শীর্ষ নেতারা সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার পরিবর্তে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের পরিবর্তে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান অংশ নিতে পারেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সম্মেলনে যোগ দিতে পারেন বলে জানা গেছে। তবে তার অংশগ্রহণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা তখনও আসেনি।
তিন দিনের কর্মসূচি
ব্রিকস সম্মেলনের বিভিন্ন পর্ব অনুষ্ঠিত হবে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে।
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর:
সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে ১০টা ১৫ মিনিট—উদ্বোধনী অধিবেশন।
সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিট—বিষয়ভিত্তিক অধিবেশন।
দুপুর ২টা ৩৫ মিনিট থেকে ৩টা ৩০ মিনিট—মধ্যাহ্নভোজ।
বিকেল ৩টা ৩০ মিনিট থেকে ৪টা ৩০ মিনিট—ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বের যাত্রা উপস্থাপন।
বিকেল ৫টা থেকে ৬টা—নেতাদের অধিবেশন।
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর:
দুপুর ২টায় সদস্য দেশগুলোর নেতাদের আগমন।
দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে সদস্য দেশগুলোর রুদ্ধদ্বার বৈঠক—‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসন ও বহুপাক্ষিকতা জোরদার’ বিষয়ে আলোচনা।
বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে ‘ভারত ইনোভেটস’ প্রদর্শনী পরিদর্শন।
বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে সদস্য নেতাদের পারিবারিক ছবি।
বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে যৌথ বৃক্ষরোপণ।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রধানমন্ত্রী মোদির আয়োজনে নৈশভোজ।
রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর:
সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশগুলোর নেতাদের আগমন।
সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে পারিবারিক ছবি।
সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে উন্মুক্ত অধিবেশন—‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন: অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ’।
নিরাপত্তার চাদরে দিল্লি
বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার দিল্লি পুলিশ সদস্য, আধাসামরিক বাহিনীর ২০০ কোম্পানি এবং ৫০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে রাজধানীজুড়ে নজরদারি চালানো হচ্ছে।
দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, পুরো শহর বন্ধ থাকবে না। তবে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের গাড়িবহর চলাচলের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী সাময়িকভাবে যান থামানো, পথ পরিবর্তন এবং নির্দিষ্ট রুটে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে এসব যানবাহন পর্যায়ক্রমে চলাচলের অনুমতি পাবে। জনসাধারণের ভোগান্তি যতটা সম্ভব কম রেখেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দিল্লি পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অতিথিদের চলাচলের সম্ভাব্য রুটগুলো আগেই পরিদর্শন করা হয়েছে। বিমানবন্দর, হোটেল, ভারত মণ্ডপমসহ বিদেশি অতিথিদের সম্ভাব্য সব গন্তব্য নিরাপত্তার আওতায় রাখা হয়েছে।
নয়াদিল্লি এলাকায় উচ্চক্ষমতার ক্যামেরা, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্তকারী ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হবে।
সম্মেলন চলাকালে ৩৫টির বেশি সড়কে যান চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মাথুরা রোড, সরদার প্যাটেল মার্গ, শান্তি পথ, জনপথ, অশোকা রোড, বারাখাম্বা রোড, টলস্টয় মার্গ, আফ্রিকা অ্যাভিনিউ রোড, নীতি মার্গ, পঞ্চশীল মার্গ এবং এপিজে আবদুল কালাম রোড।
বিশেষ করে নয়ডা থেকে মধ্য দিল্লি, পূর্ব দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং দ্বারকা ও পশ্চিম দিল্লি থেকে ধৌলা কুয়ান, বিমানবন্দর ও দক্ষিণ দিল্লিমুখী যাত্রীদের চলাচলে বাড়তি সময় লাগতে পারে।
দুই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এবারের ব্রিকস সম্মেলন তাই শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার বৈঠক নয়; ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূরাজনীতির মধ্যেও জোটটি কী ভূমিকা নিতে চায়—সেদিকেও আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে।