ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলের গভীর সমুদ্রে বিরল প্রজাতির বিগফিন স্কুইডের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ হাজার ৭৫০ ফুটেরও বেশি গভীরে গবেষণার সময় আকস্মিকভাবে ক্যামেরায় ধরা পড়ে রহস্যময় এই প্রাণীটি।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের কাছে একটি বিলুপ্ত পানির নিচের আগ্নেয়গিরি ডেভিডসন সিমাউন্টকে ঘিরে গবেষণা চালাচ্ছিলেন মন্টেরি বে অ্যাকুয়ারিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এমবিএআরআই) গবেষকেরা। সমুদ্রের তলদেশের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণের সময় তাদের রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল ‘ডক রিকেটস’-এর ক্যামেরায় ধরা পড়ে স্কুইডটি।
ডেভিডসন সিমাউন্ট মন্টেরি বে ন্যাশনাল মেরিন স্যাংচুয়ারির ভেতরে অবস্থিত এবং ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেরি শহর থেকে প্রায় ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। এমবিএআরআইয়ের পোস্টডক্টরাল গবেষক অলিভিয়া সোয়ারেস পেরেইরা নিয়ন্ত্রণকক্ষের মনিটরে নজর রাখার সময় প্রথম প্রাণীটির উপস্থিতি দেখতে পান।
তিনি জানান, ভিডিওর ওপরের এক কোণে প্রথমে কয়েকটি তাঁবুর মতো অংশ দেখা যায়। প্রথমে সেটিকে জেলিফিশ বলে মনে করেছিলেন তিনি। পরে প্রাণীটির ছোট ছোট ‘কনুই’ সদৃশ অংশ দেখা যাওয়ার পর বুঝতে পারেন, এটি আসলে বিগফিন স্কুইড।
ভিডিওতে স্কুইডটিকে দুটি বড় পাখনার সাহায্যে চলতে দেখা যায়। এর সঙ্গে ছিল আটটি লম্বা বাহু এবং দুটি অতিরিক্ত লম্বা টেনট্যাকল, যা শরীরের পেছনে অনেকটা লেজের মতো প্রসারিত ছিল।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রাণীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ দশমিক ১ ফুট। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ৭৫১ ফুট বা দুই মাইলেরও বেশি গভীরে অবস্থান করছিল। এত গভীর পানিতে মানুষের সরাসরি পর্যবেক্ষণ প্রায় অসম্ভব হওয়ায় এ ধরনের প্রাণীর অস্তিত্ব ও আচরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে গভীর সমুদ্রযান ও রোবটিক ক্যামেরার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার সময় এমবিএআরআইয়ের বেন্থিক বায়োলজি অ্যান্ড ইকোলজি টিমের বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) গবেষকেরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা ‘ডেভিড প্যাকার্ড’ নামের গবেষণা জাহাজে অবস্থান করে সমুদ্রতলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করছিলেন।
গবেষকেরা মূলত পরীক্ষা করছিলেন, ওই এলাকায় খাবারের সন্ধানে চলাচলকারী বীকড তিমি সমুদ্রের কাদাময় তলদেশে বিশেষ ধরনের দাগ বা খাঁজ তৈরি করে কি না।
নোয়ার মন্টেরি বে ন্যাশনাল মেরিন স্যাংচুয়ারির গবেষণা পরিবেশবিদ অ্যান্ড্রু ডিভোগেলেয়ার তখন সমুদ্রতলের দিকে নজর রাখছিলেন। হঠাৎ মনিটরে বিগফিন স্কুইডটি ভেসে উঠলে তিনিও বিস্মিত হন।
ডিভোগেলেয়ার প্রাণীটিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সৌন্দর্যময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার চোখে, বিশাল পাখনা নড়াচড়া করার সময় প্রাণীটিকে যেন পানির নিচে ডানা মেলা কোনো স্বর্গীয় প্রাণীর মতো দেখাচ্ছিল।
গবেষকদের জন্য আবিষ্কারটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ মন্টেরি বে ন্যাশনাল মেরিন স্যাংচুয়ারিতে এই প্রথম বিগফিন স্কুইডের দেখা মিলেছে বলে জানিয়েছেন ডিভোগেলেয়ার।
গভীর সমুদ্র পৃথিবীর সবচেয়ে কম অনুসন্ধান করা পরিবেশগুলোর একটি। সেখানে প্রচণ্ড চাপ, অন্ধকার ও অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রার কারণে বহু প্রাণী সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো সীমিত। ফলে একটি বিরল প্রাণীর হঠাৎ ক্যামেরায় ধরা পড়া শুধু একটি চমকপ্রদ দৃশ্য নয়, গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ারও সুযোগ তৈরি করে।
ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলের গভীর সমুদ্রে পাওয়া এই বিগফিন স্কুইড তাই বিজ্ঞানীদের কাছে একই সঙ্গে বিস্ময় ও গবেষণার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।