ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে ভয়াবহ দাবানলের কারণে ঘন ধোঁয়া ও বিষাক্ত কুয়াশায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশের রাজধানী পন্টিয়ানাকে বায়ুর মান বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বোর্নিও ও সুমাত্রার সাতটি প্রদেশে দাবানলের ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছেন ১ কোটি ২৫ লাখের বেশি মানুষ। ১ সেপ্টেম্বর যেখানে দাবানল-সম্পর্কিত শ্বাসতন্ত্রের রোগীর সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার ৮৯১, সেখানে ৯ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৩৬ জনে—মাত্র আট দিনে দ্বিগুণেরও বেশি।
পন্টিয়ানাকে শ্বাস নিতে কষ্ট
পশ্চিম কালিমান্তানের পন্টিয়ানাক শহরের বাসিন্দারা দিনের পর দিন ঘন ধোঁয়ার মধ্যে বসবাস করছেন। অনেকে মাস্ক ব্যবহার করেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কাশি, গলা ব্যথা, জ্বর ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ বাড়ছে।
একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান পপং সোলিহাত জানিয়েছেন, দাবানলের কারণে শ্বাসতন্ত্রের রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনেই ওই ক্লিনিকে শ্বাসকষ্টের ১৮৭টি ঘটনা চিকিৎসা করা হয়েছে, যেখানে পুরো আগস্টে এমন রোগী ছিল ৪২২ জন। বর্তমানে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১২০ জন পর্যন্ত রোগী আসছেন বলে তিনি জানান।
পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে স্বেচ্ছাসেবকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী ও অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করছেন। ‘রুমাহ অক্সিজেন’ বা ‘অক্সিজেন হাউস’ নামে একটি উদ্যোগের মাধ্যমে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ আগুন
ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষের মতে, চলতি বছরের দাবানল গত ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্রগুলোর একটি। দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং শক্তিশালী সুপার এল নিনো পরিস্থিতি আগুন ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
তবে শুধু প্রাকৃতিক কারণেই এই সংকট তৈরি হয়নি। ইন্দোনেশিয়ায় কৃষি ও বাণিজ্যিক জমি তৈরির জন্য ভূমি পরিষ্কারে আগুন ব্যবহারের প্রবণতাও দীর্ঘদিনের সমস্যা। শুকনো পিটভূমিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক সময় মাটির নিচেও জ্বলতে থাকে। ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২ লাখ ২ হাজার হেক্টর জমি আগুনে পুড়েছে। পরিবেশবিষয়ক সংস্থা YKAN-এর হিসাবে, শুধু আগস্টেই আরও প্রায় ৬ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে থাকতে পারে।
সীমান্ত পেরিয়ে ছড়াচ্ছে বিষাক্ত ধোঁয়া
দাবানলের প্রভাব ইন্দোনেশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বোর্নিওর প্রতিবেশী মালয়েশিয়াতেও ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য কয়েকটি এলাকাতেও বায়ুর মানের ওপর এর প্রভাব পড়েছে।
ঘন ধোঁয়ার কারণে বিমান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। পন্টিয়ানাকসহ পশ্চিম কালিমান্তানের কিছু এলাকায় দৃশ্যমানতা এক কিলোমিটারের নিচে নেমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ধোঁয়ার কারণে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণেও বড় প্রভাব
দাবানল শুধু স্থানীয় স্বাস্থ্য ও পরিবেশের সংকট তৈরি করছে না, বৈশ্বিক জলবায়ুতেও এর প্রভাব পড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস জলবায়ু পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার দাবানল থেকে প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ মেট্রিক টন নিঃসরণ হয়েছে, যা ওই সময়ে বিশ্বব্যাপী দাবানলজনিত মোট নিঃসরণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
আগুন নেভাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা
দাবানল নিয়ন্ত্রণে ইন্দোনেশিয়া ব্যাপকভাবে আকাশপথে পানি ছিটানো ও ক্লাউড সিডিংয়ের মতো কার্যক্রম চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তাও পাওয়া যাচ্ছে। জাপান তিনটি CH-47 চিনুক হেলিকপ্টারসহ জনবল পাঠিয়েছে; এগুলো দুর্গম এলাকায় অগ্নিনির্বাপণে ব্যবহারের কথা।
তবে আবহাওয়ার পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন না হলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুষ্ক মৌসুম অব্যাহত থাকলে আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন জনস্বাস্থ্য। কয়েক দিনের ব্যবধানে শ্বাসতন্ত্রের রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হওয়া দেখাচ্ছে, বোর্নিওর দাবানল এখন কেবল পরিবেশগত দুর্যোগ নয়—এটি দ্রুত একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটেও রূপ নিচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স