ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় সম্ভাব্য সংলাপের পথ এখনো অনিশ্চিত।
সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান একটি চুক্তি করতে আগ্রহী এবং যুক্তরাষ্ট্রও আলোচনায় বসার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছে না। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আলোচনা না চালালে তেহরান সংলাপে প্রস্তুত।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ইরান দ্রুত একটি চুক্তি করতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় যাবে কি না, সে সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নেবেন বলে জানান।
অন্যদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও আন্তর্জাতিক আইন ও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি—NPT-এর কাঠামোর মধ্যে ইরান আলোচনা করতে প্রস্তুত।
তবে তাঁর শর্তও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে, একতরফা নীতি পরিত্যাগ করতে হবে এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করা যাবে না।
আলোচনার বার্তা, কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর
কূটনৈতিক সম্ভাবনার এই ইঙ্গিতের মধ্যেই ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
১৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় রাশিয়ার বড় ব্যাংক VTB Bank-এর বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ব্যাংকটি ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তেহরানকে সহায়তা করেছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, VTB নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ইরানি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। ব্যাংকটি ইরানের আটকে থাকা বিপুল অর্থ স্থানান্তরে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রিয়াল ও রুবলে লেনদেনের একটি ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল।
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ ‘Operation Economic Outcast’-এর অংশ। এই অভিযানের লক্ষ্য ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো বিচ্ছিন্ন করা।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানকে আর্থিক, প্রযুক্তিগত বা বস্তুগত সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থাৎ একদিকে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ—দুই পথই একই সময়ে এগিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন।
হরমুজে পাল্টাপাল্টি দাবি
এই দ্বৈত পরিস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্ট হরমুজ প্রণালিতে।
পানামার পতাকাবাহী EL GAIA ট্যাংকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) নৌবাহিনীর দাবি, জাহাজটি হরমুজের দক্ষিণে একটি নিষিদ্ধ রুট দিয়ে যাওয়ার সময় নৌমাইনে আঘাত করে। এতে বিস্ফোরণ ও বড় ধরনের আগুনের সৃষ্টি হয়।
IRGC আরও দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ এবং তাদের ‘স্মার্ট নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, EL GAIA-কে এর আগেই একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছিল এবং পরে ওমানের উপকূলের কাছে অচল অবস্থায় থাকা জাহাজটিতে ইরান আবার ড্রোন হামলা চালায়।
জাহাজটি তখন আঞ্চলিক একটি দেশের সহায়তায় টেনে নেওয়া হচ্ছিল বলে জানিয়েছে CENTCOM।
ফলে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো দুই দেশের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত।
হরমুজে জাহাজ চলাচল কমছে
এদিকে সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
রয়টার্সের ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে, আগের দিন যেখানে সংখ্যা ছিল ১০। যুদ্ধ শুরুর আগের স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনায় এই পতন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি জ্বালানি বাজার, তেল পরিবহন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপরও চাপ বাড়ছে।
নতুন করে নৌ-সংঘাতের আশঙ্কা
সোমবার হরমুজ এলাকায় আরও একটি ঘটনা উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
ইরানের হরমোজগান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর আহমদ নাফিসি স্থানীয় সংবাদ সংস্থা মেহরকে বলেছেন, লারাক দ্বীপ থেকে প্রায় ১২ মাইল এবং কারগান বন্দর থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে দুটি মাছ ধরার নৌকায় ড্রোন হামলা হয়েছে। এতে কয়েকজন নাবিক নিখোঁজ হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
তবে হামলার স্বাধীন কোনো নিশ্চিতকরণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। হামলাটি কারা চালিয়েছে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
এর আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজে আরেকটি সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের খবর সামনে এসেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে Axios জানিয়েছে, একটি মার্কিন নৌ ড্রোন দখলের চেষ্টা করা ইরানি ছোট নৌযানের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালায়।
আলোচনার দরজা কতটা খোলা?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষ থেকেই আলোচনার ইঙ্গিত আসা কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক সংঘর্ষ এবং হরমুজে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট এখনো গভীর।
বিশেষ করে ওয়াশিংটন যখন ইরানের আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং তেহরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে আলোচনার অন্যতম শর্ত হিসেবে তুলে ধরছে, তখন সমঝোতার জায়গা কতটা তৈরি হয়েছে—তা এখনো পরিষ্কার নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজের নিরাপত্তা। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথে জাহাজ চলাচল কমে গেলে এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, তেল আমদানিনির্ভর দেশ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।