গাজা উপত্যকার এমন কোনো এলাকা যেন অবশিষ্ট নেই, যেখানে ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কা নেই। ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এলাকাগুলোতেও যেকোনো সময় বিমান হামলা, সামরিক অভিযান কিংবা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা। যেন সর্বত্র মৃত্যু তাড়া করে ফিরছে মানুষকে।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকাতেও হামলার মাত্রা বাড়ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। সংকীর্ণ এই অঞ্চলে শত শত হাজার মানুষ বসবাস করলেও হামলার ঝুঁকি থেকে তারা মুক্ত নন।
রাতভর আকাশে ড্রোন ও নজরদারি বিমান
গাজা শহরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাতে কয়েক দফা ফ্লেয়ার ছোড়া হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। একই সময়ে কোয়াডকপ্টার ও নজরদারি বিমান দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে উড়তে দেখা যায়। রাতের নীরবতার মধ্যে এসব বিমানের শব্দ পুরো উপত্যকাজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। বাসিন্দাদের জন্য এটি এখন আর নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। দীর্ঘদিন ধরে হামলা, সামরিক অভিযান ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করতে করতে এমন পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মানেই ভয় বা উদ্বেগ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রতিটি শব্দই বাসিন্দাদের মনে নতুন হামলার আশঙ্কা তৈরি করে।
একদিনেই পাঁচজনের মৃত্যু
ইসরায়েলি হামলায় বুধবার অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনায় নিহত হন। অন্য দুজন আগের হামলায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। হতাহতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে গাজা শহরের তুফাহ এলাকায়, খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এবং মধ্য গাজায়।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় হতাহতের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। রয়েটার্সে রপ্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হন; তাদের মধ্যে দুই শিশু ছিল। খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি তাঁবুতে হামলায় একজন পুরুষ ও আট বছরের একটি মেয়ে নিহত এবং আরও ১৪ জন আহত হন। এর একদিন পর গাজা শহরে যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন ধসে অন্তত ২০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। উদ্ধারকারীদের হিসাবে ভবনটির ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকা পড়েছিলেন।
যুদ্ধ থামেনি, বদলেছে শুধু ধরন
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় বড় আকারের সামরিক সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে। ফলে গাজার বাসিন্দাদের কাছে যুদ্ধবিরতির অর্থ অনেকাংশেই বদলে গেছে। বড় আকারের স্থলযুদ্ধের পরিবর্তে বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, নজরদারি ও সীমিত সামরিক অভিযানের মধ্যেই তাদের জীবন কাটছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ১ হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে রয়েটার্স জানিয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই বসবাস
গাজার মানবিক সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব। যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত বহু ভবন এখনো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর গাজা শহরে একটি ক্ষতিগ্রস্ত ছয় থেকে সাততলা ভবন ধসে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়। জাতিসংঘ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে এখনো বাস্তুচ্যুত মানুষ বসবাস করছেন। অর্থাৎ মানুষের সামনে যেন দুটি ঝুঁকি- হামলার আশঙ্কা এবং আশ্রয় নেওয়া ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা।
মৃত্যু সর্বত্র
গাজার বর্তমান বাস্তবতা বর্ণনা করতে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক নূর খালেদের ভাষ্য, উপত্যকার সর্বত্রই মৃত্যুর উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে। কোথাও বিমান হামলার শব্দ, কোথাও ড্রোনের গুঞ্জন, কোথাও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের সন্ধান; প্রতিদিনের জীবন যেন এসব ঘটনার মধ্যেই আটকে আছে।
তার ভাষায়, ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা ও অনুপ্রবেশের ধারাবাহিকতা গাজার বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে আরও সংকুচিত করে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি থাকলেও হামলা ও হতাহতের ঘটনা অব্যাহত থাকায় গাজায় স্থায়ী শান্তি কতটা দূরে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আর এর মধ্যে বেসামরিক মানুষ প্রতিদিনই নতুন হামলার আশঙ্কা নিয়ে রাত কাটাচ্ছেন।