মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছে তেহরান।
ইরানের সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। কোনো নতুন হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও স্বার্থের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী পাল্টা হামলা চালানো হবে বলেও সতর্ক করেছে ইরান।
তবে ইরানের এই দাবির স্বাধীন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রও নতুন হামলার বিষয়ে এমন কোনো সামরিক পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। ফলে তেহরানের অভিযোগকে আপাতত একটি গুরুতর সামরিক সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের শুরু ২৮ ফেব্রুয়ারির মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা থেকে। এরপর কয়েক মাস ধরে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। জুনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়েছিল, কিন্তু সেটি জুলাইয়ের মধ্যে ভেঙে পড়ে। মূল বিরোধগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ।
২০ সেপ্টেম্বর ইরানের সামরিক কেন্দ্রীয় কমান্ড সতর্ক করে বলেছে, নতুন মার্কিন হামলা হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, তাদের আঞ্চলিক মিত্রদেরও সংঘাতের পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ নতুন করে হামলা শুরু হলে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া শুধু মার্কিন ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে—এমন বার্তাই দিয়েছে তেহরান।
এই সতর্কবার্তার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইয়েমেনে হুথিদের নতুন সামরিক অভিযান এবং সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়েছে। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সংঘাতের সঙ্গে ইয়েমেন, সৌদি আরব এবং লোহিত সাগরের ঘটনাগুলো এখন একই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটের অংশ হয়ে উঠছে।
ট্রাম্পের কঠোর বার্তা
ইরানের সতর্কবার্তার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ২০ সেপ্টেম্বর তিনি ইরানকে চুক্তিতে আসার আহ্বান জানান এবং সতর্ক করেন যে সমঝোতা না হলে ইরান ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ কিংবা আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে পারে। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যটি দেখা যাচ্ছে—একদিকে সামরিক হুমকি, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা। অর্থাৎ সংঘাত চললেও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এর আগে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র জুনের সমঝোতায় নিজেদের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এলে তেহরানও সেই কাঠামোয় ফিরতে প্রস্তুত। ১ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছিলেন, ওয়াশিংটন তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলে ইরানও একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
হরমুজ এখন বড় প্রশ্ন
সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে বৈশ্বিক বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এই জলপথ অপরিহার্য।
ইরান জানিয়েছে, জুনের সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলবে না। তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করলেই হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রশ্নে অগ্রগতি হতে পারে।
এর ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। হরমুজে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত থাকার সঙ্গে ইয়েমেনের বাব আল-মান্দাব এলাকায় হুথিদের সামরিক উপস্থিতি যুক্ত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একই সময়ে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ইয়েমেনের নতুন ফ্রন্ট
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে ইয়েমেনে হুথিদের নতুন সামরিক অগ্রগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। হুথিরা সম্প্রতি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করেছে এবং বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর পর সৌদি আরবের দিকে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এবং হুথিদের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত আলাদা দুটি যুদ্ধক্ষেত্র হলেও উভয়ের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক যোগসূত্র রয়েছে। ওয়াশিংটন হুথিদের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে; তেহরান এই ধরনের বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ঝুঁকি
নতুন হামলা হলে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর স্বাগতিক দেশগুলো। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
এরই মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। সম্ভাব্য উত্তেজনার কারণে বিমান চলাচল বন্ধ হওয়া, আকাশসীমা পরিবর্তন এবং অন্যান্য ভ্রমণ বিঘ্নের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অতীতে ইরানি হামলায় এই অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ফলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আঞ্চলিক মিত্রদের সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
কূটনীতির শেষ দরজা কি খোলা?
সামরিক হুমকি যতই বাড়ুক, কূটনীতির সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেওয়ার ভিসা অনুমোদন করেছে।
এই কূটনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুই পক্ষই একদিকে নিজেদের সামরিক অবস্থান শক্ত করছে, অন্যদিকে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছে না।
তবে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—কোন শর্তে যুদ্ধবিরতি বা নতুন সমঝোতায় ফিরবে দুই পক্ষ? ইরান চাইছে মার্কিন অবরোধ ও চাপ কমুক এবং আগের সমঝোতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হোক। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের সামরিক সক্ষমতা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক কার্যক্রম নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইছে।
সামনে তিনটি সম্ভাব্য চাপ
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই নতুন বড় সামরিক অভিযান শুরু করে কি না। দ্বিতীয়ত, ইরান নতুন হামলার জবাবে সরাসরি মার্কিন ঘাঁটি বা আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে কিনা। তৃতীয়ত, হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে উত্তেজনা আরও বাড়ে কি না।
এই তিনটি ক্ষেত্রের যেকোনো একটিতে বড় পরিবর্তন ঘটলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে হামলা বা অবরোধ বাড়লে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে সামরিক হুমকি ও কূটনৈতিক বার্তা পাশাপাশি চলছে। ইরান নতুন হামলার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্রও চাপ বজায় রাখছে। একই সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে দুই দেশের কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ফলে আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন হামলা শুরু হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে; আবার কূটনৈতিক যোগাযোগ কার্যকর হলে উত্তেজনা কমানোর একটি পথও তৈরি হতে পারে। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না কোন পথটি শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পাবে। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত যে নতুন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি ও নৌবাণিজ্যের ওপর চাপ তৈরি করছে—সেটি ইতোমধ্যে স্পষ্ট।