ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসী মিলিশিয়া’ আখ্যা দিয়ে পবিত্র মক্কা লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সৌদি মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন বলে দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানিয়েছে। বাদশাহ সালমান অভিযোগ করেন, হুথিরা বারবার পবিত্র নগরী মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করছে। তিনি এ ঘটনাকে ‘জঘন্য অপরাধ’ এবং বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের অনুভূতিতে উসকানি হিসেবে বর্ণনা করেন।
মক্কা লক্ষ্য করার অভিযোগ
এর আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, হুথিদের ছোড়া একটি ড্রোন মক্কার দিকে যাওয়ার সময় প্রতিহত করা হয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি ছিল, এটি মক্কাকে লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার চেষ্টা। তবে হুথি নেতৃত্ব অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেছে।
হুথি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুথি সৌদি দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে ড্রোনটি আসলে মক্কাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
মক্কায় এর আগে প্রায় এক দশক পর প্রথমবারের মতো নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছিল বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। পবিত্র কাবা শরিফ মক্কায় অবস্থিত হওয়ায় ঘটনাটি সৌদি আরবের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বেও ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে।
সৌদি শহরেও হুথিদের হামলা
মক্কার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হুথিদের হামলা-পাল্টা হামলা বাড়ছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি ভূখণ্ডের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার পথে প্রতিহত করা হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর হুথিরা রিয়াদে ‘সংবেদনশীল’ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে। সৌদি জোটও রিয়াদের দিকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল।
এ ছাড়া তাইফ, বিশ, ফারাসান ও ইয়ানবুর মতো এলাকাতেও হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এসব হামলার কিছু ঘটনায় বেসামরিক মানুষের হতাহত হওয়ার খবরও এসেছে।
বাদশাহর বিরল কঠোর মন্তব্য
সৌদি আরবের দৈনন্দিন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের বড় অংশ ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান পরিচালনা করলেও, বাদশাহ সালমানের মঙ্গলবারের বক্তব্যকে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তার বিরল ও সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে আল জাজিরা।
বাদশাহ সৌদি সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রশংসা করে বলেন, তারা দেশের নিরাপত্তা এবং পবিত্র স্থান, হজযাত্রী, নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করছে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ইয়েমেনের সংঘাত এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ইয়েমেনে পাল্টা হামলার ফলে সংঘাতটি আঞ্চলিক মাত্রা পাচ্ছে।
একই সময়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দাব ঘিরেও লড়াই তীব্র হয়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুথিরা ইয়েমেনের রেড সি উপকূলের বিস্তৃত অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি কাহবুব পাহাড়ি এলাকায়ও অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। এই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগপথের কাছাকাছি হওয়ায় সংঘাতের প্রভাব আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও পড়তে পারে।
এদিকে সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করেন এবং আঞ্চলিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
ফলে মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার সৌদি অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলেও, ঘটনাটির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উৎস নিয়ে হুথিদের অস্বীকৃতিও রয়েছে। তবে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে বাদশাহ সালমানের কঠোর বক্তব্য দুই পক্ষের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।