গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার গাজায় যে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, স্পেন তার ‘দ্ব্যর্থহীন’ নিন্দা জানায়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। গাজা, ইরান ও লেবাননের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধও আলোচনায় রয়েছে।
সানচেজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, গত আট বছর ধরে স্পেন ‘যেখান থেকেই শুরু হোক, সব ধরনের আগ্রাসী যুদ্ধের’ বিরোধিতা করে আসছে। তাঁর ভাষায়, ইউক্রেন, লেবানন কিংবা ইরান কোনো ক্ষেত্রেই আগ্রাসনের পক্ষে স্পেন অবস্থান নেয়নি।
সামরিক ব্যয় বাড়ানোর বিরোধিতা
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার সামরিক ব্যয় বাড়ানোর পথে যায়নি এবং জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী আগ্রাসন এড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, স্পেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং ইসরায়েলি সরকারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী সামরিক অভিযানে স্পেনের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে স্পেনের অবস্থান গত কয়েক বছর ধরেই ইউরোপের মধ্যে আলোচিত। ২০২৫ সালে সানচেজ সরকার ইসরায়েলের ওপর পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের উদ্যোগ নেয় এবং পরে স্পেনের পার্লামেন্টও এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা অনুমোদন করে।
গাজা নিয়ে কঠোর অবস্থান
জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে সানচেজ বলেন, “নেতানিয়াহু এখনো গাজায় যে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছেন, স্পেন তার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানায়।” তাঁর এই মন্তব্য জাতিসংঘ অধিবেশনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্পেনের কঠোর অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা।
তবে ‘গণহত্যা’ অভিযোগটি আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলাও চলমান। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২২ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যে গাজার পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও আদালতের আদেশ সব পক্ষকে মেনে চলতে হবে।
ইসরায়েল অবশ্য গাজায় গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ইসরায়েলি সরকারের বক্তব্য, তাদের সামরিক অভিযান হামাসের বিরুদ্ধে পরিচালিত এবং বেসামরিক হতাহতের জন্য তারা হামাসকে দায়ী করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গাজা ইস্যুতে স্পেন তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৪ সালে স্পেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে গাজায় মানবিক সহায়তা বাড়ানো এবং ইসরায়েলের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির পক্ষেও মাদ্রিদ অবস্থান নিয়েছে।
২০২৫ সালে সানচেজ সরকার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি পদক্ষেপ ঘোষণা করে। এর মধ্যে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো বিষয় ছিল।
সানচেজের জাতিসংঘের বক্তব্য তাই শুধু গাজা নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং স্পেনের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিক অবস্থান হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেন থেকে ইরান একই নীতির কথা বললেন সানচেজ
বক্তব্যে সানচেজ শুধু গাজা নয়, ইউক্রেন, লেবানন ও ইরানের সংঘাতের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে গিয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করা।
জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস ২২ সেপ্টেম্বর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত হয়ে পড়ছে এবং বেসামরিক মানুষ এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে। তিনি যুদ্ধ বন্ধ, মানবিক সহায়তা প্রবাহ নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৌ চলাচলের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
দুই রাষ্ট্র সমাধানের আহ্বান
গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতির পাশাপাশি ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস ২২ সেপ্টেম্বরের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বলেন, ১৯৬৭ সালের আগের সীমারেখার ভিত্তিতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন দুই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সহাবস্থানই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির বিশ্বাসযোগ্য পথ। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, উচ্ছেদ ও ভূমি দখল নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সানচেজের বক্তব্যও সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক বিতর্কের অংশ। তাঁর বক্তব্যে গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নকে স্পেনের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইউরোপের ভেতরেও মতভেদ
গাজা ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান এক নয়। কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে কিছু দেশ ইসরায়েলের নিরাপত্তার অধিকারের ওপর জোর দিয়ে হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।
ফলে সানচেজের জাতিসংঘের বক্তব্য শুধু স্পেনের অবস্থানই তুলে ধরেনি; ইউরোপের মধ্যকার নীতিগত মতপার্থক্যও সামনে এনেছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘে তাঁর বক্তব্যে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং দেশটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ফলে এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে গাজা প্রশ্নটি শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয় হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, অস্ত্র সরবরাহ এবং ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছে।
সানচেজের বক্তব্যে সেই বিতর্কে স্পেনের অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়েছে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা, ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে সংঘাতের সমাধানের দাবি।