জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে (ইউএনজিএ) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্য দেওয়ার সময় নিউইয়র্কে একাধিক বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভ থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি জানানো হয়। বিক্ষোভ থেকে ১০৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে নিউইয়র্ক পুলিশ।
বিক্ষোভকারীদের একজন হোসে বলেন, তিনি নিউইয়র্কে জন্মেছেন ও বেড়ে উঠেছেন। তার ভাষায়, “বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর এখানে আসা নিউইয়র্কের প্রতি সম্পূর্ণ অসম্মান।” তিনি নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে উল্লেখ করে বলেন, তারা এমন কর্মকাণ্ড মেনে নেন না।
ইহুদি সংগঠন জিউইশ ভয়েস ফর পিস (JVP)-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কাছে আয়োজিত একটি কর্মসূচিতে সেলিব্রিটি, সংগঠক ও রাজনীতিকসহ ৪০০ জনের বেশি মানুষ অংশ নেন। নেতানিয়াহুর ইউএনজিএ ভাষণের আগে বিক্ষোভকারীরা ফার্স্ট অ্যাভিনিউয়ের একটি অংশে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচিটির নেতৃত্বে ছিল JVP ও এনওয়াইসি ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (NYC-DSA)।
ফিলিস্তিন ইয়ুথ মুভমেন্টের সদস্য ও JVP-এর বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নাস ইসা বলেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার দাবি, সেই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে রয়েছে শক্তি প্রয়োগ ও যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়মুক্তি।
বিক্ষোভকারীরা গাজায় ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার সঙ্গে নিউইয়র্কের ভূমিকার বিষয়টিও সামনে আনেন। এর আগের দিন NYC-DSA জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে এক সংবাদ সম্মেলন করে বিমানবন্দর দিয়ে ইসরায়েলে সামরিক ও বিস্ফোরক সরঞ্জাম পাঠানো অবিলম্বে বন্ধ এবং অতীতে পাঠানো সামরিক সহায়তার বিষয়ে আরও স্বচ্ছতার দাবি জানায়।
বৃহস্পতিবার পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সড়ক ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (NYPD) জানায়, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ১০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পরে সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
আয়োজকদের দাবি, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নয়জন ছিলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অথবা নির্বাচনে প্রার্থী।
নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের ডেমোক্রেটিক মনোনীত প্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়েরও আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর ‘দ্য হেগে’ থাকা উচিত, নিউইয়র্কের রাস্তায় নয় এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ারও কথা নয়।
JVP-এর সংগঠক জেস ফ্র্যাঙ্কেল ক্যারেল বলেন, একজন ইহুদি নিউইয়র্কবাসী হিসেবে তিনি চান যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের পরিবর্তে দেশের নিজস্ব জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় করা হোক। তার ভাষায়, করদাতাদের অর্থ দিয়ে শিশুদের ওপর বোমা হামলা নয়, বরং দেশের স্কুলে অর্থায়ন করা উচিত।
এর কয়েক ঘণ্টা পর আরেকটি পৃথক বিক্ষোভে হাজারো মানুষ জাতিসংঘ সদর দপ্তরের দিকে মিছিল করেন। ফিলিস্তিন ইয়ুথ মুভমেন্ট ও দ্য পিপলস ফোরাম এই কর্মসূচির আয়োজন করে।
ফিলিস্তিন ইয়ুথ মুভমেন্টের সংগঠক তাহের দাহলেহ বলেন, নেতানিয়াহু কেন নিউইয়র্কে মাত্র ১০ ঘণ্টা অবস্থান করতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট। তার দাবি, আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত বা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের জন্য নিউইয়র্ক নিরাপদ আশ্রয়স্থল নয়।
নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফরকে কেন্দ্র করে এসব বিক্ষোভ যখন রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে, তখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের গাজা নীতির পক্ষে বক্তব্য দেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে—এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি এ অভিযোগকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন, ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় ইসরায়েল বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানিকেও আক্রমণ করেন। তিনি মামদানিকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে ইসরায়েল সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেন। নেতানিয়াহুর দাবি, মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নিউইয়র্কে অনেক ইহুদি নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না।
জবাবে মামদানি বলেন, নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন’ হিসেবে তুলে ধরতে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ পুনরাবৃত্তি করছেন। তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এখনো রয়েছে।
মেয়র নির্বাচনী প্রচারের সময় মামদানি নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাকে গ্রেপ্তার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে পরে তিনি স্বীকার করেন, এমন গ্রেপ্তার কার্যকর করার আইনি ক্ষমতা তার নেই।
বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভকারীদের কাছে নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফর ছিল গাজা নিয়ে তাদের বক্তব্য জাতিসংঘের বাইরে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার একটি সুযোগ। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি গাজা পরিস্থিতিতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তাহের দাহলেহ বলেন, জাতিসংঘ ইসরায়েলকে বারবার সময়সীমা ও সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু তাতে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তার মতে, এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ‘সহযোগিতা’ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।