রিয়াদে জরুরি বৈঠকে বসছেন তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধানরা

ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত এবং সৌদি আরবের ওপর একের পর এক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে রিয়াদে জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক প্রধানরা। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সৌদি আরবকে সম্ভাব্য সহায়তার বিষয়টি বৈঠকে আলোচনায় আসবে।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল সেলচুক বায়রাকতারোগ্লু রিয়াদে গিয়ে সৌদি ও পাকিস্তানের সমপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তিন দেশের সামরিক প্রধানরা জরুরি বৈঠকে বসবেন।

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনভিত্তিক ইরান-সমর্থিত হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার পর এই বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বৈঠকের সুনির্দিষ্ট তারিখ এবং কী ধরনের সামরিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির মূল নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর লক্ষ্য যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো।

চুক্তির আওতায় ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে প্রথম কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সামরিক প্রধানরা অংশ নেন। বৈঠকে সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এখন ইয়েমেন থেকে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বাড়ায় চুক্তিটির কার্যকারিতার প্রথম বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে তিন দেশ।

সৌদি আরব জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলা করছে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বৃহস্পতিবার সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, তায়েফ ও ইয়ানবুর দিকে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

হুথিরাও সৌদি আরবের রিয়াদ ও ইয়ানবুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। তবে এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, হুথিদের আরও উত্তেজনা সৃষ্টির প্রচেষ্টা ‘দৃঢ়ভাবে’ মোকাবিলা করা হবে। হামলার আশঙ্কায় সৌদি সিভিল ডিফেন্স কয়েকটি এলাকায় সতর্কতাও জারি করেছিল।

সৌদি আরবের সামরিক প্রয়োজন দেখা দিলে তুরস্ক সহযোগিতা করতে পারে বলে আঙ্কারা এর আগে জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তুরস্ক ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযান চালাবে—এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি।

মক্কা চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু সরাসরি যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিন দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, সামরিক বাহিনীর সমন্বয় এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ প্রযুক্তি ও উৎপাদনের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে।

ফলে রিয়াদের বৈঠকে বিমান প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, নজরদারি, সামরিক প্রস্তুতি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষার মতো বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়—তিন দেশের পক্ষ থেকে এখনো নির্দিষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

এই বৈঠকে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানও অন্যতম অংশীদার। ৩১ আগস্টের বৈঠকের পর তিন দেশ যৌথ প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে চুক্তিটির কাঠামো আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নওমান মাহমুদকে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব করা হয়েছে এবং রিয়াদে জোটের সচিবালয় স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে ইয়েমেনে হুথি ও সরকারপন্থী বাহিনীর সংঘর্ষও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় হুথিদের সামরিক তৎপরতা বাড়ায় বাব আল-মানদাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ফলে সৌদি ভূখণ্ডে হামলার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তাও তিন দেশের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

রিয়াদের আসন্ন বৈঠক তাই শুধু তিন দেশের সামরিক প্রধানদের নিয়মিত বৈঠক নয়; ইয়েমেন সংঘাতের বিস্তার এবং সৌদি ভূখণ্ডে হামলার মধ্যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, তিন দেশ সৌদি আরবকে কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে বা তুরস্ক ও পাকিস্তান সরাসরি ইয়েমেন সংঘাতে যুক্ত হবে কি না—সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।