হিজবুল্লাহর সাবেক প্রধান হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যুর দুই বছর পূর্তিতে তাঁর আদর্শ ও কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, নাসরাল্লাহ তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়ে এখনো ‘জীবিত’ এবং তাঁর পথ তাঁর উত্তরসূরি নাঈম কাসেমের নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়েছে।
আইআরজিসি বলেছে, ‘প্রতিরোধ ফ্রন্টকে’ সমর্থন করা, নিপীড়িতদের অধিকার রক্ষা এবং কুদস বা জেরুজালেমের ‘পূর্ণ মুক্তি’ পর্যন্ত অবিচল থাকা—তাদের ভাষায়—আইআরজিসি ও ইরানের অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ও মানবিক দায়িত্ব।
নাসরাল্লাহ ২০০০-এর দশক থেকে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে লেবাননের রাজনীতি ও আঞ্চলিক সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। তাঁর মনোনীত উত্তরসূরি হাশেম সাফিয়েদ্দিনও কয়েক দিন পর ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। পরে নাঈম কাসেম হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
নাসরাল্লাহর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে কাসেমও বলেন, ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে দুর্বল করতে চাইলেও সংগঠনটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। তিনি দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আগে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কোনো সমঝোতায় যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে আইআরজিসি শুধু নাসরাল্লাহর উত্তরাধিকার নিয়েই কথা বলেনি, কৌশলগত হরমুজ প্রণালি নিয়েও মন্তব্য করেছে।
আইআরজিসির ভাষ্য, বর্তমান ‘সভ্যতাগত ও অস্তিত্বগত লড়াইয়ের’ প্রেক্ষাপটে কৌশলগত এই জলপথের ওপর ‘প্রতিরোধ ফ্রন্টের’ নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা তাদের ভাষায় ‘ঈমান ও ঐশ্বরিক বিজয়ের প্রতি বিশ্বাসের’ অন্যতম অর্জন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও কঠোর হয়েছে। আগস্টে আইআরজিসি জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরান জানিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে ও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে তারা প্রস্তুত।
নাসরাল্লাহর মৃত্যুর দুই বছর পরও হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। চলতি বছরের মার্চে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক হামলা ও সামরিক অভিযান হয়েছে। লেবাননের হিসাব অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
লেবাননের সরকার হিজবুল্লাহর অস্ত্রের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে নাঈম কাসেম বলেছেন, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তনের আগে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা করা হবে না।
ফলে নাসরাল্লাহর মৃত্যুর দুই বছর পরও তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তরাধিকার ঘিরে ইরান, হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অব্যাহত রয়েছে। আইআরজিসির সর্বশেষ বিবৃতি থেকে বোঝা যায়, তেহরান এখনো ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’কে আঞ্চলিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে বিবৃতিতে ব্যবহৃত ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘ঐশ্বরিক বিজয়’-সংক্রান্ত বক্তব্যগুলো আইআরজিসির নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।