ইরানকে নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের খবরকে ‘ভুয়া’ বললেন ট্রাম্প

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে অগ্রগতির বিনিময়ে দেশটিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় এবং জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার খবর অস্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত কোনো সমঝোতায় ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে ‘বাস্তব অগ্রগতি’ দেখালে এমন ছাড় দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন আগ্রহী।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানকে নিষেধাজ্ঞা ছাড় বা জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার কোনো প্রস্তাব তিনি দেননি। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনকে তিনি ‘ভুয়া’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ইরানকে তিনি ‘কিছুই’ প্রস্তাব করেননি।

তবে এর কয়েক ঘণ্টা আগেই অ্যাক্সিওস ও সিএনএনের প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট ও বাস্তব অগ্রগতির বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানের জব্দ করা তহবিলে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প রাজি হতে পারেন।

আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি

মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ আলোচনা চলছে। তবে পারমাণবিক ইস্যুতে সমাধান না হলে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হবে না বলেও ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এতে বোঝা যাচ্ছে, দুই দেশের সম্ভাব্য আলোচনায় হরমুজ প্রণালি ছাড়াও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, সমঝোতা হলে সাত দিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু এবং আঞ্চলিক সংঘাতে বিরতি আনার কথা ছিল। তবে ট্রাম্প সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

ওয়াশিংটনের শর্ত, তেহরানের অবস্থান

মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের প্রস্তাবে নিষেধাজ্ঞা ও জব্দ করা অর্থ নিয়ে তাৎক্ষণিক ছাড় চাওয়া হয়েছিল। মার্কিন জাতিসংঘ দূত মাইক ওয়াল্টজের ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরান আগে সব সুবিধা চাচ্ছিল এবং এরপর আলোচনা করতে চাইছিল—যা ওয়াশিংটনের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের পথই অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার উপায়। তেহরান জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত অবস্থান জানার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ফলে দুই পক্ষের অবস্থানে এখনও বড় পার্থক্য রয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে; আর যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কেন্দ্রে রয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে দ্বৈত বার্তা

ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যে একদিকে ইরানকে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়ার কথা অস্বীকার করা হয়েছে, অন্যদিকে এর আগেই তিনি চলতি সপ্তাহে তেহরানের সঙ্গে আরও আলোচনার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ সামরিক চাপ বজায় রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন পক্ষের আলোচনায় বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুক্ত রয়েছেন।

নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের খবর কেন গুরুত্বপূর্ণ

নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা জব্দ করা অর্থে প্রবেশের সুযোগ ইরানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ছে।

তবে ট্রাম্পের সরাসরি অস্বীকৃতির কারণে নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মার্কিন প্রস্তাব প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি। ফলে আপাতত দুটি পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে রয়েছে—মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে সম্ভাব্য ছাড়ের খবর এবং ট্রাম্পের সরাসরি অস্বীকার।

এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী আলোচনায় মূল নজর থাকবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং জব্দ করা ইরানি অর্থ—এই চারটি বিষয়ে দুই পক্ষ কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে তার ওপর।