কিয়েভের বিজ্ঞান একাডেমিতে রুশ ড্রোন হামলা, নিহত ১০

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কেন্দ্রস্থলে ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস ভবনে রুশ জেটচালিত ড্রোন হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। একই দিনে ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রাশিয়ার ব্যাপক ড্রোন হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা ১০ জনে পৌঁছেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮০ জনের বেশি।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) কিয়েভের ঐতিহাসিক কেন্দ্রের বিজ্ঞান একাডেমি ভবনে একটি ড্রোন আঘাত হানে। হামলার পর ভবনটিতে আগুন ধরে যায় এবং ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। উদ্ধারকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা ব্যক্তিদের সন্ধান চালান। ভবনের ওপরের তলা থেকে দুইজনকে জরুরি মই দিয়ে উদ্ধার করা হয়।

কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হামলায় ২৪ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হামলার সময় শহরের বিভিন্ন এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে এবং আকাশে কালো ধোঁয়া দেখা যায়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে দ্রুতগতির ও বেশি উচ্চতায় উড়তে সক্ষম জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার বাড়িয়েছে।

রাতের ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, সোমবার ইউক্রেনের দিকে ছোড়া ১২০টি ড্রোনের মধ্যে ৯০টি ছিল জেটচালিত। এসব ড্রোন প্রতিহত করতে ইউক্রেনের সক্ষমতা এখনো সীমিত। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ড্রোন প্রতিহতের হার ছিল ৫৭ শতাংশ।

জেলেনস্কি জানান, নতুন ধরনের ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধী ড্রোন সক্রিয়ভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিছু সামরিক ইউনিট এগুলো ব্যবহারও করছে। তবে কার্যকারিতা ও ব্যাপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও উন্নতি প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞান একাডেমির পাশাপাশি কিয়েভে একটি ওষুধ কোম্পানি, কয়েকটি পেট্রল স্টেশন ও একটি চিকিৎসাকেন্দ্রেও হামলা হয়েছে বলে জেলেনস্কি জানিয়েছেন। অন্যান্য শহর ও অঞ্চলে বেসামরিক স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং যোগাযোগ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই সিবিহা কর্মদিবসে একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি ইউক্রেনের মিত্রদের আরও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছেন।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ডিনিপ্রোতেও রুশ ড্রোন হামলায় একটি ব্যবসাকেন্দ্রে তিনজন নিহত হয়েছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই হামলায় ১৯ জন আহত হয়েছেন। ভবনটির আশপাশে আবাসিক ভবন, পার্ক, গ্রন্থাগার ও বিভিন্ন অফিস ছিল।

আঞ্চলিক গভর্নর ওলেক্সান্দর হানঝা বলেন, দিনের কর্মব্যস্ত সময়ে ওই এলাকায় শত শত মানুষ অবস্থান করছিলেন।

এ ছাড়া ডিনিপ্রোর দক্ষিণ-পূর্বে সিনেলনিকোভো শহরের একটি লজিস্টিকস অফিসে হামলায় আরও একজন নিহত হয়েছেন। জাপোরিঝঝিয়া শহরের অবকাঠামোতেও হামলা হয়েছে; সেখানে ৩২ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে জরুরি সেবা বিভাগ।

জেলেনস্কি আরও বলেন, ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এইচইউআর-এর একটি প্রতিবেদনে রাশিয়ার নতুন করে সেনা নিয়োগের উদ্যোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন পদ্ধতিতে রুশ বাহিনীতে নিয়োগের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।

জেলেনস্কি আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালে কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের অভিযানের মোকাবিলায় রাশিয়ায় পাঠানো প্রায় ৮ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা এখনো দেশটিতে রয়েছে এবং আরও ১০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ায় নতুন করে ব্যাপক সেনা সমাবেশের পরিকল্পনার বিষয়টি অস্বীকার করে এটিকে ‘সম্পূর্ণ অর্থহীন’ বলে অভিহিত করেছেন।

রাশিয়ার হামলার পাশাপাশি ইউক্রেনও রুশ ভূখণ্ডে দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার তেল শোধনাগার এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সোমবার রাশিয়ার ক্রাসনোদার অঞ্চলের কয়েকটি তেল স্থাপনা এবং দুটি প্রতিরক্ষা কারখানায় হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন।

দুই পক্ষই বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

রুশ হামলায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এমন এক সময়ে বাড়ছে, যখন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুদ্ধের অবসান নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। কিয়েভের সর্বশেষ হামলা এবং নতুন ধরনের দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহার ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।