যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পরস্পরের কাছ থেকে আমদানি করা মোট ৬ হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্যে শুল্ক কমানোর উদ্যোগে সম্মত হয়েছে। তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা, গম, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের পাশাপাশি চীনের খেলনা, কফি মেকার, টোস্টারসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য রয়েছে। তবে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পণ্য এ তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বোর্ড অব ট্রেডের আওতায় দুই দেশই নিজ নিজ দেশ থেকে আমদানির জন্য প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার মূল্যের অ-সংবেদনশীল পণ্য শুল্ক সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিসন গ্রিয়ার বলেছেন, এর মাধ্যমে চীনে রপ্তানি করা প্রায় ৩০ শতাংশ মার্কিন পণ্যের জন্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর এই শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে দুই দেশ বিদ্যমান বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চীনের প্রস্তাবিত তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা, গম, জোয়ার, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, উদ্ভিজ্জ তেল ও তেলবীজের মতো বিভিন্ন কৃষিপণ্য রয়েছে। মাছ ও সামুদ্রিক খাবার, কাঠ ও কাঠজাত পণ্য, প্রসাধনী এবং চিকিৎসা সরঞ্জামও তালিকায় রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের চীনমুখী সবচেয়ে বড় কৃষিপণ্য রপ্তানিগুলোর একটি সয়াবিন তালিকায় নেই। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীনে প্রায় ১৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন রপ্তানি করেছিল। এ কারণে মার্কিন সয়াবিন শিল্পের প্রতিনিধিরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের তালিকায় চীনের বিভিন্ন ভোক্তা পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ছোট গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি—যেমন কফি মেকার ও টোস্টার—টেবিলওয়্যার, কম্বল, বিছানার চাদর এবং খেলনা উল্লেখযোগ্য।
খেলনা ও শিশুদের পণ্যের বড় একটি অংশও তালিকায় রয়েছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা খেলনা আমদানির মূল্য ছিল প্রায় ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। তবে পরের বছর উচ্চ শুল্কের কারণে তা কমে প্রায় ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
শুল্ক কমানোর বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হলেও কত শতাংশ শুল্ক কমানো হবে এবং ঠিক কবে থেকে তা কার্যকর হবে—এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি। দুই দেশের প্রকাশিত বিবৃতিতেও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
এ ছাড়া সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পণ্যগুলো এই শুল্ক কমানোর তালিকায় নেই। ফলে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ পুরোপুরি মিটে গেছে—এমনটি বলার সুযোগ নেই।
বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়লো
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হলে দুই দেশ চলমান সমঝোতাগুলো পর্যালোচনা এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধ নিরসনে আরও আলোচনা করার সুযোগ পাবে।
চীনের ভাষ্য, বর্ধিত যুদ্ধবিরতি দুই দেশের ব্যবসা ও পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত পরিবেশ তৈরি করবে। দুই দেশ বিনিয়োগের সুযোগ, বাজারে প্রবেশের বাধা এবং বাণিজ্যনীতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে।
দুই দেশের আলোচনায় কৃষিপণ্য বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ জন্য একটি কৃষিবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে, যা চলতি বছরের শেষের আগে প্রথম বৈঠক করবে।
এ ছাড়া ২০২৭ ও ২০২৮ সালে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ কোটি মেট্রিক টন কয়লা আমদানির বিষয়ে চীন সম্মত হয়েছে। তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অপরিশোধিত তেল এই সমঝোতার তালিকায় রাখা হয়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই দেশ যোগাযোগের একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করতে সম্মত হয়েছে। এআই-সংক্রান্ত কোনো ঘটনা বা সংকট দেখা দিলে তা নিয়ে যোগাযোগ এবং নভেম্বরের শেষ নাগাদ পরবর্তী দফার আলোচনা করার কথা রয়েছে।
চীন আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মূলধন রয়েছে—এমন বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চীনে ব্যবসা পরিচালনা ও শাখা খোলার অনুমোদনের বিষয়টি তারা বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল বাড়ানো নিয়েও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।