ফ্রান্সে শিক্ষক সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ১৬৪

ফ্রান্সে স্কুল শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে আন্দোলনে ‘উসকানি দিয়ে উত্তেজনা বাড়ানো’কে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দেশজুড়ে বিভিন্ন স্কুলে বিক্ষোভ ও অবরোধের ঘটনায় ১৬৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত ক্লাস ও অবকাঠামোগত সমস্যাসহ বিভিন্ন দাবিতে গত সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন প্রথমে প্যারিসের আশপাশের অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ফ্রান্সের অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার প্রায় ১৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আন্দোলনের কারণে কোনো না কোনোভাবে বিঘ্নিত হয়েছে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বিক্ষোভের সময় আতশবাজি, অগ্নিসংযোগ ও স্কুলের আশপাশে সহিংসতার অভিযোগ তুলে বলেন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী কিংবা পুলিশ সদস্যদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার কোনো ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি একই সঙ্গে বলেন, স্কুলগুলোর সমস্যাগুলো অবশ্যই শুনতে হবে এবং সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। তবে সহিংসতারও স্পষ্টভাবে নিন্দা জানাতে হবে এবং যারা সহিংসতায় জড়িত, তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সোমবারের বিক্ষোভে ১২ জন নিরাপত্তাকর্মী, প্রায় এক ডজন শিক্ষার্থী এবং আটজন শিক্ষা বিভাগের কর্মী আহত হয়েছেন। আহত শিক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনজন স্কুলপ্রধানও রয়েছেন।

সোমবার ১৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আন্দোলনের কারণে প্রভাবিত হয়। এর মধ্যে কয়েকটি স্কুল পুরোপুরি অবরুদ্ধ ছিল, আবার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে অবরোধের চেষ্টা হয়েছে।

আন্দোলনের সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ও বিভিন্ন ধরনের বস্তু ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কোথাও কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

বিশেষ করে প্যারিসের আশপাশের কিছু এলাকায় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মূলত শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি এবং অবকাঠামোর অবস্থা নাজুক।

শিক্ষার্থীদের সংগঠন Union Syndicale Lycéenne (USL) জানিয়েছে, শিক্ষক ও শিক্ষা বিভাগের কর্মীর ঘাটতি, জরাজীর্ণ স্কুল, অতিরিক্ত ক্লাস ও সময়সূচি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনপ্রক্রিয়া Parcoursup-কে ঘিরে তৈরি চাপ—এসব সমস্যা আন্দোলনের অন্যতম কারণ।

সংগঠনটি মঙ্গলবার দেশজুড়ে স্কুল অবরোধের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের অধিকার ও শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই এই কর্মসূচি।

সোমবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষক, হাসপাতালকর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনও বেতন ও কর্মপরিবেশসহ নানা দাবিতে কর্মবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।

সরকার বলছে, শিক্ষার্থীদের অনেক দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য হলেও আন্দোলনের সঙ্গে সহিংসতা যুক্ত হওয়া মেনে নেওয়া হবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ বিক্ষোভের কিছু ঘটনাকে সাধারণ প্রতিবাদের সঙ্গে তুলনা না করে ‘নগর সহিংসতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, কিছু ব্যক্তি মুখ ঢেকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর প্রস্তুতি নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সংগঠন ও কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন সরকারের এই অবস্থানের সমালোচনা করেছে। তাদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও জীবনযাপনের বাস্তব সমস্যাগুলো থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানানোর অধিকার তাদের রয়েছে।

আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু এবং বামপন্থি দল La France Insoumise (LFI)-এর নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে।

লেকর্নু অভিযোগ করেছেন, LFI-এর কিছু নেতা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি এটিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে মেলঁশোঁ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তার ভাষ্য, আন্দোলনে অংশ নেওয়া স্কুল শিক্ষার্থীরা মূলত নিজেদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই প্রতিবাদ করছে।

ফ্রান্সের আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই আন্দোলন রাজনৈতিক বিতর্কেরও অংশ হয়ে উঠছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মূল দাবিগুলো শিক্ষা খাতের শিক্ষক সংকট, অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়েই কেন্দ্রীভূত।

এদিকে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশি ব্যবহারের বিষয়েও তদন্তের কথা জানা গেছে। একটি ঘটনায় ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত গ্রেনেড লঞ্চার থেকে ছোড়া একটি রাউন্ডে এক স্কুল শিক্ষার্থী আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি তদন্তাধীন।

মঙ্গলবার দেশজুড়ে আরও বিক্ষোভ ও স্কুল অবরোধের ডাক থাকায় ফ্রান্সের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।