ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী বিমানে ককপিটে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ওমানি কো-পাইলট ‘ইসলামপন্থী উগ্রবাদে দীক্ষিত’ ছিলেন এবং আত্মঘাতী মানসিকতা নিয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, বিমানের যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা কো-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর তিনি বারবার ‘কিল মি, কিল মি’ (আমাকে মেরে ফেলো) বলে চিৎকার করছিলেন। নেতানিয়াহুর ভাষ্য, এ ঘটনা থেকে তার আত্মঘাতী উদ্দেশ্যের বিষয়টি স্পষ্ট বলে মনে হয়েছে।
তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। কো-পাইলটের উদ্দেশ্য, তিনি একাই এই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না এবং কোনো সংগঠন বা রাষ্ট্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল কি না—এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির পেছনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, পূর্বপরিকল্পনা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে।
৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটটি দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। উড্ডয়নের প্রায় দুই ঘণ্টা পর ওমানি কো-পাইলট ভারতীয় নাগরিক ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্চারকে ছুরিকাঘাত করেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এরপর বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যে বিমানটি প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতা হারায়। আহত ক্যাপ্টেন কোনোভাবে ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হলে কয়েকজন যাত্রী ভেতরে ঢুকে কো-পাইলটকে কাবু করেন। পরে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।
যাত্রীদের হস্তক্ষেপের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। নেতানিয়াহু পরে ওই যাত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। আহত ক্যাপ্টেন মাচ্চারকেও বিভিন্ন মহল সাহসিকতার জন্য প্রশংসা করেছে। ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুস্থ হয়ে উঠছেন।
নেতানিয়াহু বলেন, তদন্তে পাওয়া ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েল মনে করছে কো-পাইলট ‘ইসলামপন্থী উগ্রবাদে দীক্ষিত’ হয়েছিলেন। তবে তিনি এ দাবির বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করেননি।
রয়টার্স জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী কো-পাইলটের মধ্যে উগ্রবাদী মতাদর্শের প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে তদন্ত এখনো চলমান এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি।
নেতানিয়াহু এর আগে সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ঘটনাটি আত্মহত্যার প্রচেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। তবে তিনি তখনও হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা বলেননি।
ঘটনার সঙ্গে ইরানের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বলেছেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের সঙ্গে যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন। তবে তিনি কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেননি এবং বলেছেন, বিষয়টি এখনো তদন্ত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো যোগসূত্রের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এখনো সময় লাগবে। ফলে এ মুহূর্তে কো-পাইলটের সঙ্গে ইরান বা কোনো সংগঠনের যোগাযোগ ছিল—এমন দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
ঘটনার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান প্রসিকিউটর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এতে হামলার উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সন্ত্রাসী যোগসূত্র, পূর্বপরিকল্পনা এবং অন্য কারও নির্দেশ বা সহযোগিতা ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষও প্রাথমিক তদন্ত চালানোর পর কো-পাইলটকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করছে।
এদিকে ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, ঘটনার কারণ সম্পর্কে তদন্ত চলছে। ফলে কো-পাইলটের মানসিক অবস্থা, উগ্রবাদে দীক্ষা বা সম্ভাব্য সন্ত্রাসী উদ্দেশ্য—নেতানিয়াহুর বক্তব্যের বাইরে এসব বিষয়ে এখনো স্বাধীনভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা তীব্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল ওই ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।