মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও হামলা চালানোর পরিকল্পনা ইরানের

যুক্তরাষ্ট্র যদি পুনরায় বড় ধরনের সামরিক হামলা চালায়, তবে আরও ব্যাপক ও শক্তিশালী পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। কূটনৈতিক আলোচনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ ধরে নিয়েই দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব এই সামরিক ছক কষছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ওয়াশিংটন কোনো নতুন সামরিক অভিযান শুরু করলে এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডাররা এখন মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর বাইরেও তাদের সম্ভাব্য হামলার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন। নতুন পরিকল্পনায় মার্কিন সামরিক অভিযানে সমর্থন দেওয়া দেশসমূহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের বেশ কিছু স্থানকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরার পর থেকে শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডাররা ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য পরবর্তী হামলার সময়কাল এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের মাত্রা নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা করছেন। যদিও এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে দুই পক্ষের কারোর মধ্যেই আপসের লক্ষণ না থাকায় সামরিক পরিকল্পনা আরও জোরদার করা হয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং পরবর্তী সাত মাসের সংঘাতের ধারাবাহিকতায় এই নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি। গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ৪০ দিনের যুদ্ধের অবসান হলেও মাঝে মাঝেই ছোটখাটো সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বড় ধরনের কোনো অভিযান চালাবেন নাকি কেবল পরমাণু কেন্দ্রে সীমিত হামলা চালাবেন, তা নিয়ে তেহরান নিশ্চিত নয়। তবে তারা প্রতীকী কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বড় আকারের সংঘাতের পথ বেছে নিতে প্রস্তুত, যাতে মার্কিন পক্ষকে কার্যকরভাবে নিরস্ত করা যায়।

একই সঙ্গে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঝুঁকি ও মার্কিন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও হিসেব-নিকাশে রাখছে তেহরান। কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের হামলা চালালে লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমন্বিতভাবে হরমুজ প্রণালী থেকে শুরু করে অঞ্চলের মার্কিন স্বার্থে একযোগে হামলা চালাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথও খোলা রাখছে তেহরান। কারণ দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও তেল রপ্তানি বন্ধ থাকা মার্কিন অবরোধের ফলে ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে রয়েছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে একটি প্রস্তাব পাঠায় তেহরান। এতে যুদ্ধ বিরতি, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, ১২ বিলিয়ন ডলারের জমা থাকা অর্থ মুক্ত করা এবং তেল ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তবে ট্রাম্প এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার কাতারের মাধ্যমে তাদের পাল্টা প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছে, যা বর্তমানে তেহরানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন পরমাণু কর্মসূচিকে আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেও ইরান তা তাদের দেওয়া শর্তাবলী পূরণের পরেই কেবল আলোচনা শুরু করার বিষয়ে অনড়।

ফোরেনসিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার সামরিক হামলা ও অর্থনৈতিক ব্লকেডের ফলে ইরানের সরকার ও অর্থনীতি চরম চাপের মুখে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে তেহরানের রাজনীতিতে। গত জানুয়ারিতে খারাপ অর্থনীতির কারণে দেশজুড়ে যে গণবিক্ষোভ হয়েছিল, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আবারও তা ফিরে আসার ভয় পাচ্ছে প্রশাসন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স