কানাডার রাজনীতিতে আবারও সামনে এসেছে কুইবেকের স্বাধীনতার প্রশ্ন। ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কুইবেক প্রাদেশিক নির্বাচনে বিচ্ছিন্নতাবাদী পার্তি কেবেকোয়া (পিকিউ) সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে। কিন্তু দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে একদিকে কুইবেকের স্বাধীনতার বিতর্ক নতুন করে জোরালো হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু সরকার হিসেবে পিকিউকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করেই এগোতে হবে।
কুইবেকের ১২৭ আসনের জাতীয় পরিষদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬৪টি আসন। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী পিকিউ পেয়েছে ৫৯টি আসন, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে পাঁচটি কম। কুইবেক লিবারেল পার্টি পেয়েছে ৪০টি, কনজারভেটিভ পার্টি ১৯টি এবং কেবেক সলিডেয়ার ৯টি আসন। ক্ষমতাসীন কোয়ালিশন আভেনির কেবেক (সিএকিউ) কোনো আসনই ধরে রাখতে পারেনি।
পিকিউ নেতা পল সাঁ-পিয়ের প্লামন্দোঁ নির্বাচনী প্রচারে কুইবেকের কানাডা থেকে স্বাধীনতার বিষয়ে নতুন গণভোট আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি গণভোট আয়োজন করবেন না। অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনতার গণভোটের দিকে যাওয়ার পরিবর্তে দলটি ভবিষ্যতের জন্য বিষয়টি রাজনৈতিক এজেন্ডায় রাখছে।
কুইবেকের স্বাধীনতা নিয়ে এর আগে ১৯৮০ ও ১৯৯৫ সালে গণভোট হয়েছিল। দুবারই স্বাধীনতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৯৯৫ সালের গণভোটে ব্যবধান ছিল অত্যন্ত কম। ফলে কুইবেকের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতি কানাডার ইতিহাসে দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন। তবে এবারের নির্বাচনের ফলকে স্বাধীনতার পক্ষে সরাসরি গণরায় হিসেবে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
নির্বাচনের আগে ও পরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুইবেকের স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থন এখনো প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বেলাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের ভোটে স্বাধীনতার প্রশ্নের চেয়ে ক্ষমতাসীন সিএকিউ সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল পাঁচটি বড় দলের মধ্যে ভোটের বিভাজন। পিকিউ প্রায় ২৮ শতাংশ ভোট পেয়েও সবচেয়ে বেশি আসন অর্জন করেছে। কুইবেক লিবারেল পার্টি পেয়েছে প্রায় ২৪ দশমিক ২ শতাংশ, কনজারভেটিভ পার্টি প্রায় ২০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কেবেক সলিডেয়ার প্রায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট।
অর্থাৎ কোনো একটি দলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট না থাকলেও নির্বাচনী আসনের হিসাব পিকিউকে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, পাঁচ দলের মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় পিকিউ প্রায় ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট পেয়েও সবচেয়ে বেশি আসন দখল করেছে। এখানেই এবারের নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য। পিকিউ ক্ষমতায় ফিরেছে, কিন্তু তার পেছনে কুইবেকের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট নেই। ফলে স্বাধীনতার প্রশ্নে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান বাস্তবায়নের জন্য তাকে শুধু জনমত নয়, জাতীয় পরিষদের অন্যান্য দলের অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় পিকিউ সরকারকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আইন ও আস্থাভোটে বিরোধী দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে। লিবারেল, কনজারভেটিভ ও কেবেক সলিডেয়ারের অবস্থানও স্বাধীনতার প্রশ্নে এক নয়। ফলে পিকিউয়ের জন্য স্বাধীনতার গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতীয় পরিষদে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া সহজ হবে না। বিশেষ করে লিবারেল ও কনজারভেটিভ নেতৃত্ব স্বাধীনতার উদ্যোগের বিরোধিতা করার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে কেবেক সলিডেয়ারও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান করলেও তাদের সঙ্গে পিকিউয়ের অন্যান্য নীতি ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে পার্থক্য রয়েছে। ফলে কুইবেকের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্বাধীনতার প্রশ্নটি একদিকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও অন্যদিকে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাধা রয়েছে।
নির্বাচনের ফল কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির জন্যও একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। কার্নি জাতীয় ঐক্যকে গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কের চাপ মোকাবিলায় কানাডার প্রদেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন। পিকিউয়ের বিজয়ের পর কার্নি দলটির নেতা প্লামন্দোঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং কুইবেক সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্যের মূল বার্তা হলো- শক্তিশালী কুইবেক এবং শক্তিশালী কানাডা পরস্পরবিরোধী নয়।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও জটিল। কুইবেকে একটি স্বাধীনতাপন্থী দল সরকার গঠন করার পর অটোয়াকে এখন এমন একটি প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য কানাডার বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামো থেকে কুইবেককে আলাদা করা। কুইবেকের স্বাধীনতার বিতর্ক এবার এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও চাপ রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং কানাডাকে ঘিরে তার বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য দেশটির জাতীয়তাবাদী আবেগকে জোরালো করেছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের শুল্কনীতি কুইবেকের স্বাধীনতার প্রশ্নকে নতুন একটি প্রেক্ষাপটে নিয়ে এসেছে। পিকিউ নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে স্বাধীনতার গণভোট না করার অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে কুইবেকের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন ঐতিহাসিক উচ্চতার তুলনায় এখনো কম। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার টানাপোড়েন স্বাধীনতাপন্থী রাজনীতিকে শক্তিশালী করবে, নাকি উল্টো কানাডার জাতীয় ঐক্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কুইবেকের নির্বাচনের ফলের গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ কানাডার আরেক প্রদেশ আলবার্টায়ও স্বাধীনতা-সংক্রান্ত একটি ভোট সামনে রয়েছে। ১৯ অক্টোবর আলবার্টাবাসী কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে গণভোট আয়োজন করা হবে কি-না, সে বিষয়ে ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে একই মাসে কানাডার দুটি ভিন্ন প্রদেশে স্বাধীনতা বা বিচ্ছিন্নতার প্রশ্ন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তবে কুইবেকের নির্বাচন এবং আলবার্টার সম্ভাব্য ভোটের প্রকৃতি এক নয়, এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
কুইবেকের নির্বাচনে একটি স্বাধীনতাপন্থী দল সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে; কিন্তু আলবার্টার ভোটের বিষয়টি হলো স্বাধীনতা নিয়ে ভবিষ্যতে গণভোট আয়োজন করা হবে কি না। দুটি ঘটনাকে একই ধরনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যথাযথ হবে না। কুইবেকের নতুন সরকার কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কতটা সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অর্থনীতি, আবাসন, অভিবাসন, ভাষানীতি, জ্বালানি, অবকাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য এসব বিষয়ে অটোয়া ও কুইবেকের স্বার্থের সমন্বয় প্রয়োজন।
অন্যদিকে পিকিউ যদি স্বাধীনতার প্রশ্নকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে পরিণত করে, তাহলে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারকে একই সঙ্গে কুইবেকের স্বায়ত্তশাসন ও জাতীয় ঐক্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। তবে বর্তমান ফলাফল থেকে এখনই কানাডা ভেঙে যাওয়ার মতো কোনো সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পিকিউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি এবং স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থনও সংখ্যাগরিষ্ঠ পর্যায়ে নেই। বরং এবারের নির্বাচন দেখিয়েছে, কানাডার ফেডারেল কাঠামোর ভেতরে আঞ্চলিক পরিচয়, ভাষা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ এখনো শক্তিশালী নির্বাচনী বিষয়।
কুইবেকের নির্বাচনের ফল তাই একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিচ্ছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন পর একটি স্বাধীনতাপন্থী দল আবার প্রাদেশিক ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরেছে। দ্বিতীয়ত, সেই দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই সরকার পরিচালনা করতে হবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে কুইবেকের স্বাধীনতার প্রশ্ন কতটা এগোয়, পিকিউ কীভাবে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির কেন্দ্রীয় সরকার কুইবেকের সঙ্গে কী ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছায়, এসবই কানাডার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠবে।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো- কুইবেকের ভোট স্বাধীনতার প্রশ্নকে আবার জাতীয় আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে; কিন্তু সেটি এখনো কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থনের প্রমাণ নয়। বরং এটি কানাডার ফেডারেল রাজনীতিতে আঞ্চলিক পরিচয় ও জাতীয় ঐক্যের সম্পর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।