একসময় তিনি ছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা, পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তাঁর দায়িত্ব ছিল সেনাসদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা বোঝা ও চিকিৎসা করা। কিন্তু ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর সেই সামরিক ব্যবস্থার ভেতরেই ভয়াবহ এক হত্যাকাণ্ডের কারণে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন নিদাল মালিক হাসান (Nidal Malik Hasan)। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে তাঁর গুলিতে প্রাণ হারান ১৩ জন; আহত হন আরও ৩২ জন।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৩ সালে হাসানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে দণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ফলে প্রায় ১৭ বছর আগের হত্যাকাণ্ডটি আবারও সামনে এসেছে—এবার শুধু অপরাধ ও বিচার নয়, রাষ্ট্রীয় শাস্তি প্রকাশ্যে দেখানোর নৈতিকতা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক। সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP)।
শৈশব, শিক্ষা ও সামরিক চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন
নিদাল মালিক হাসানের জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে চিকিৎসা পেশায় প্রশিক্ষণ নেন এবং পরে আর্মি মেডিকেল কোরের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ওয়াল্টার রিড আর্মি মেডিকেল সেন্টারে প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবা প্রদান।
সেনাবাহিনীতে তাঁর দায়িত্বের সঙ্গে যুদ্ধ, সামরিক চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো যুক্ত ছিল। সহকর্মীদের ভাষ্য ও পরবর্তী তদন্তে তাঁর কিছু মন্তব্য এবং আচরণ নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে আসে। তবে এসব তথ্য একা তাঁর পরবর্তী অপরাধের পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না। কোনো ব্যক্তির পেশা, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দায়িত্ব কিংবা ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে তাঁর সহিংস আচরণের কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
৫ নভেম্বর ২০০৯: ফোর্ট হুডে কী ঘটেছিল?
ফোর্ট হুড ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর সেখানে সেনাসদস্যরা একটি সামরিক চিকিৎসাকেন্দ্রে টিকা নেওয়া ও মোতায়েনের আগে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
সেই সময় হাসান একটি হ্যান্ডগান দিয়ে গুলি চালান। হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে হাসানও আহত হন; পরবর্তী সময়ে তিনি কোমরের নিচ থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে শুরু করেন।
মার্কিন সিনেটের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যান্ড গভর্নমেন্টাল অ্যাফেয়ার্স কমিটির তদন্তে ঘটনাটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সমন্বয়ের বড় ব্যর্থতা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়। তদন্তকারীরা হামলার আগে পাওয়া তথ্যের যথাযথ মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল: সম্ভাব্য ঝুঁকির কিছু ইঙ্গিত থাকার পরও কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন হামলাকারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়; নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ, দায়িত্ব বণ্টন এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের কার্যকারিতাও এর সঙ্গে জড়িত।
আনোয়ার আল-আওলাকির সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে তদন্ত
হামলার আগে হাসানের সঙ্গে ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত উগ্রপন্থী প্রচারক আনোয়ার আল-আওলাকির ই-মেইল যোগাযোগ ছিল। বিষয়টি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসে এবং এফবিআই এ নিয়ে তদন্ত করে।
প্রাথমিক তদন্তে যোগাযোগগুলোকে তাঁর পেশাগত গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু হামলার পর সেই মূল্যায়ন ও তদন্তের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০১১ সালে প্রকাশিত মার্কিন সিনেটের প্রতিবেদনে গোয়েন্দা তথ্য ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি: কোনো সন্দেহভাজনের সঙ্গে উগ্রপন্থী প্রচারকের যোগাযোগ পাওয়া এবং সেই যোগাযোগের ভিত্তিতে অপরাধের সব কারণ নির্ধারণ করা এক বিষয় নয়। হাসানের অপরাধের দায় আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; তবে হামলার আগে বিভিন্ন সংস্থা কী জানত এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী করা সম্ভব ছিল, তা পৃথক তদন্তের বিষয়।
কেন হামলা চালিয়েছিলেন হাসান?
বিচারের সময় হাসান দাবি করেন, মুসলিম দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বন্ধ করার উদ্দেশ্যে তিনি হামলা চালিয়েছিলেন। তিনি আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিরোধিতার কথাও তুলে ধরেন। আদালতে তিনি নিজের অপরাধের দায় স্বীকার করেন এবং নিজের পক্ষে আইনজীবীর পরিবর্তে নিজেই বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
তবে তাঁর বক্তব্যকে হামলার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটি ব্যক্তিগত দাবি হিসেবে দেখতে হবে; সেটিকে সহিংসতার ন্যায্যতা হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। যুদ্ধনীতি বা সামরিক অভিযানের বিরোধিতা এবং নিরস্ত্র বা অপেক্ষমাণ মানুষকে হত্যা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
একইভাবে, হাসানের ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সব মুসলমান কিংবা ইসলাম সম্পর্কে সাধারণীকরণ করাও তথ্যগতভাবে ভুল। একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় তাঁর নিজের; তা কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায় নয়।
বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের রায়
২০১৩ সালে সামরিক আদালতে হাসানের বিচার অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ১৩টি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং ৩২টি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। ২৩ আগস্ট জুরি তাঁকে দোষী ঘোষণা করে এবং পাঁচ দিন পর মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি নির্ধারণ করে।
হাসানের বিচার পরিচালনার ধরনও আলোচনার বিষয় ছিল। তিনি তাঁর আইনজীবীদের সরিয়ে দিয়ে নিজেই নিজের পক্ষে অবস্থান নেন। সামরিক আদালত তাঁর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অভিযোগ বিবেচনা করে রায় দেয়।
দীর্ঘ আপিলপ্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সামরিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে করা পর্যালোচনার আবেদন নাকচ করে। পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলে মার্কিন সেনাবাহিনীর ৭ অক্টোবর ২০২৬-এর ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬: মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ ঘোষণা
মার্কিন সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ অক্টোবর ২০২৬ হাসানের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত সেনাসচিব অ্যাডাম টেলে ৬ অক্টোবর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে দণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেন।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ৩ ডিসেম্বর ২০২৬ স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় টেক্সাসের ফোর্ট হুডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা রয়েছে। বর্তমানে হাসান কানসাস অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট লিভেনওয়ার্থে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কারাগারে বন্দি।
এটি এখনো একটি ঘোষিত ভবিষ্যৎ সূচি—মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে, এমন নয়। আইনি আবেদন বা অন্য কোনো কারণে কার্যক্রমের তারিখ পরিবর্তিত হতে পারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে আইনবিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নতুন আইনি আবেদন কার্যকর হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়সূচি বিলম্বিত হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার: নতুন বিতর্ক
এই মামলার সাম্প্রতিকতম আলোচনার বিষয় হলো মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ৭ অক্টোবর এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মানুষকে এ ধরনের অপরাধের গুরুতর পরিণতি দেখানোর ব্যবস্থা করা হবে। পরদিন পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে নিশ্চিত করেন যে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা হবে; বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় শাস্তির কার্যক্রম জনগণের সামনে প্রকাশ করলে বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়বে, নাকি মৃত্যুদণ্ডকে জনসমক্ষে প্রদর্শনীতে পরিণত করা হবে? দ্বিতীয়ত, শাস্তি কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি দেখানো হলে তা ভুক্তভোগীদের পরিবার, বন্দির মর্যাদা এবং জনমানসের ওপর কী প্রভাব ফেলবে?
আইন ও মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ মনে করেন, প্রকাশ্য সম্প্রচার রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে পারে। অন্যদের আশঙ্কা, এতে আইনি ও নৈতিক জটিলতা তৈরি হবে এবং শাস্তির উদ্দেশ্যের সঙ্গে জনসমক্ষে সহিংসতা প্রদর্শনের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে অতীতে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের প্রচলন ছিল। তবে আধুনিক যুগে রাষ্ট্রীয়ভাবে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা একটি বিরল ঘটনা। হাসানের ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়িত হলে সামরিক বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে।
একটি হত্যাকাণ্ডের বাইরে যে প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে
নিদাল মালিক হাসানের ঘটনা শুধু একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার অপরাধের কাহিনি নয়। এটি একই সঙ্গে সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়, উগ্রপন্থী মতাদর্শের প্রভাব, যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বিচারব্যবস্থার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
১৩ জন নিহত ও ৩২ জন আহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এবং তাঁদের পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা উচিত। অপরাধের দায় নির্ধারণে আদালতের রায় গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কোথায় ব্যর্থতা হয়েছিল, তা বোঝাও জরুরি।
ডিসেম্বরের নির্ধারিত তারিখ যত এগিয়ে আসবে, ততই নজর থাকবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া ও সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার দিকে। কিন্তু এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা কেবল শাস্তি কার্যকরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বরং কীভাবে আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতার শিকার মানুষদের ন্যায়বিচার দেওয়া যায়, সেই প্রশ্নেও।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী (Army.mil), মার্কিন সিনেটের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যান্ড গভর্নমেন্টাল অ্যাফেয়ার্স কমিটির ফোর্ট হুড তদন্ত প্রতিবেদন এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP News)।