জেলে পাঠানোর হুমকি থেকে ঘনিষ্ঠতা

ট্রাম্প ও জাকারবার্গের বদলে যাওয়া সম্পর্কের গোপন রসায়ন

মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গের জন্য এটি ছিল এক বিজয়ের মুহূর্ত। গত মাসে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি বসেছিলেন একদম মূল কেন্দ্রে। তাঁর চারপাশে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীরা (সিইও)। তারা সবাই জাকারবার্গের তৈরি করা একটি খসড়া নীতিমালায় স্বাক্ষর করেন, যেখানে এআই প্রযুক্তির মারাত্মক ঝুঁকিগুলো আইন করে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের "স্বনিয়ন্ত্রণ" (self-police) করার রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল। বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউসের বাইরে এসে জাকারবার্গ এটিকে "ঐতিহাসিক" হিসেবে আখ্যা দেন।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জাকারবার্গ বলেন, "আমি মনে করি না যে এর আগে এরকম কোনো ঘটনা ঘটেছে।"

ওয়াশিংটন ডিসিতে জাকারবার্গের এই আধিপত্য বিস্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তৈরি হওয়া নতুন সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত এক পৃথক এআই তদারকি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন বানচাল করে দিয়েছেন। এমনকি হোয়াইট হাউসের হস্তক্ষেপে চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন সিনেট কমিটির মুখোমুখি হয়ে সাক্ষ্য দেওয়া থেকেও রেহাই পান মেটা প্রধান।

অথচ কিছুদিন আগেও চিত্রটি এমন ছিল না। এই জাকারবার্গকেই একসময় জেলে পাঠানোর হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প, আর জাকারবার্গ নিজেও বন্ধুদের কাছে বলেছিলেন যে তিনি রাজনীতি থেকে চিরতরে দূরে থাকতে চান।

পুরানো শত্রুতা ও নতুন সমীকরণ

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন ক্যাপিটল হিলে হামলার পর সহিংসতা ছড়ানোর আশঙ্কায় ট্রাম্পের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন জাকারবার্গ। এতে ট্রাম্প চরম ক্ষুব্ধ হন এবং জাকারবার্গকে "যাবজ্জীবন কারাদণ্ড" দেওয়ার হুমকি দেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাকালেও ট্রাম্প সোশ্যালে হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছিলেন, "আমরা ভালো করেই জানি তোমরা কারা। জাকারবাক্স (Zuckerbucks), সাবধানে থেকো!"

তবে পেনসিলভেনিয়ায় এক নির্বাচনী জনসভায় ট্রাম্পের ওপর প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা এবং রক্তমাখা মুখে ট্রাম্পের হাত তোলার দৃশ্য দেখে জাকারবার্গের মনোভাব বদলাতে শুরু করে। এক সাক্ষাৎকারে জাকারবার্গ একে "আমার দেখা জীবনের অন্যতম সেরা 'ব্যাডঅ্যাস' (সাহসী) দৃশ্য" হিসেবে বর্ণনা করেন। এর কয়েক সপ্তাহ পরই ট্রাম্প প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, জাকারবার্গকে এখন তাঁর "অনেক বেশি পছন্দ"।

ট্রাম্পের মন জয়ের কৌশল

ট্রাম্প নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর জাকারবার্গ ও মেটা প্রশাসন ডেমোক্র্যাটঘেঁষা ভাবমূর্তি মুছে রিপাবলিকান পার্টির সাথে সম্পর্ক জোরদারে জোর তৎপরতা শুরু করে।

অনুদান ও সহায়তা: ট্রাম্পের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ১০ লাখ ডলার অনুদান দেন জাকারবার্গ। এ ছাড়া হোয়াইট হাউসের বলরুম প্রকল্পের প্রাথমিক অর্থায়ন এবং ট্রাম্পের ফেসবুক স্থগিতাদেশ সংক্রান্ত একটি মামলা নিষ্পত্তিতে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয় মেটা, যার বড় অংশ যাবে ট্রাম্পের হবু প্রেসিডেন্ট লাইব্রেরি তহবিলে।

কৌশলী নিয়োগ: ওয়াশিংটনে মেটার প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে বর্ষীয়ান রিপাবলিকান কর্মকর্তা জোয়েল কাপলানকে দায়িত্ব দেন জাকারবার্গ। পরবর্তীতে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা দিনা পাওয়েল ম্যাককরমিককে মেটার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দিনা পাওয়েলের নিয়োগকে অত্যন্ত চতুর পদক্ষেপ বলে প্রশংসা করেন খোদ ট্রাম্প।

নীতিমালা শিথিলকরণ: ডানপন্থী ভাবধারার পোস্ট সেন্সরশিপের যে অভিযোগ ছিল, তা দূর করতে নিজেদের কনটেন্ট মডারেশন পলিসিতে বড় পরিবর্তন আনে মেটা।

ফলপ্রসূ রাজনৈতিক রূপান্তর

টেক কনসালট্যান্ট ও মেটার প্রাক্তন নীতি পরিচালক কেটি হারবাথের মতে, "মার্ক বুঝতে পেরেছিলেন যে ইলন মাস্কের মতো প্রশাসনকে প্রভাবিত করতে হলে সম্পর্ক মেরামত করতে হবে। হোয়াইট হাউসের এআই বৈঠকের সাফল্যই প্রমাণ করে যে তিনি বর্তমানে এতে সফল হয়েছেন।"

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কোনো আইনি কঠোর বাধ্যবাধকতা ছাড়াই প্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ীদের হাতেই তদারকির সুযোগ দিয়ে এই এআই চুক্তিটি তৈরি করেন জাকারবার্গ এবং এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং। জাকারবার্গের এই গতিশীল ও শিথিল দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের ধারণার সাথে পুরোপুরি মিলে গেছে।

তবে ওয়াশিংটনে জাকারবার্গের এই প্রভাব বিস্তার নিয়ে ট্রাম্পের নিজস্ব বলয়ের অনেক কট্টর সমর্থক ও ডেমোক্র্যাটদের মাঝে চরম ক্ষোভ রয়েছে। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনসহ একাধিক ডেমোক্র্যাট সিনেটর ইতোমধ্যে মেটার অর্থায়ন ও সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে তদন্তের দাবি তুলে চিঠি পাঠিয়েছেন।

রাজনীতিতে এই দ্রুত ডিগবাজি ও গিরগিটির মতো রূপ পরিবর্তনের কারণে মেটা সিইও-কে এখন ওয়াশিংটনে ‘পলিটিক্যাল ক্যামেলিয়ন’ বা ‘রাজনৈতিক বহুরূপী’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: সিএনএন