এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা ততই তুঙ্গে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার শান্তিতে নোবেল পাওয়ার দাবি জানালেও বিশ্লেষকদের মতে তার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ।
অসলোর নোবেল ইনস্টিটিউট এ বছর মোট ২৮৭টি মনোনয়ন নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি সংস্থা রয়েছে। বিভিন্ন হিসাব বলছে, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংকটের এই সময়ে ট্রাম্পকে পেছনে ফেলে সম্ভাব্য বিজয়ীদের দৌড়ে এগিয়ে আছেন অনেক মহারথি।
ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, অন্য যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় তিনি বিশ্বশান্তির জন্য অনেক বেশি কাজ করেছেন এবং তাকে পুরস্কার না দিলে তা নোবেল কমিটির জন্য অসম্মানজনক হবে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকিয়ে বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন বলেও তার দাবি। ২০২৫ সালের বিজয়িনী মারিয়া কোরিনা মাচাদো তার মেডেলটি ট্রাম্পকে উপহার দিলেও নোবেল কমিটি জানিয়েছে, পুরস্কারের সম্মান কেবল তাদের মনোনীত বিজয়ী ব্যক্তির সঙ্গেই যুক্ত থাকে। বিভিন্ন দেশ ট্রাম্পকে মনোনীত করলেও বিশেষজ্ঞরা তাকে বিজয়ী হিসেবে দেখছেন না।
অসলোর পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন জারলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বেশ কিছু শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম। এই তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছেন ইউক্রেনের শিশু অধিকার কর্মী মাইকোলা কুলেবা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’। মাইকোলা কুলেবা রাশিয়া থেকে অপহৃত হাজার হাজার ইউক্রেনীয় শিশুকে উদ্ধার করে পরিবারে ফিরিয়ে আনার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি, গৃহযুদ্ধকবলিত সুদানে খাবার, পানি ও চিকিৎসা সরবরাহ করে লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করছে বেসামরিক নাগরিকদের তৃণমূল নেটওয়ার্ক ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ বা সিপিজে-ও নোবেলের বড় দাবিদার। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড ১২৯ জন সাংবাদিক প্রাণ হারান, যার মধ্যে গাজা ছিল সাংবাদিকদের জন্য ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক অঞ্চল। অন্যদিকে, বহুপাক্ষিক সহযোগিতার বিরল প্রতীক হিসেবে ৪০০ কিলোমিটার উচ্চতায় আবর্তিত আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএস-কে সম্ভাব্য প্রার্থী ধরা হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করে। এ ছাড়া বৈশ্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-র নামও জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে প্রায় একই রকম অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করেছে দ্য ইন্ডিয়ার এক্সপ্রেস। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর আলোচনায় থাকা অন্য নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, সুদানের জরুরি ত্রাণকর্মীদের নেটওয়ার্ক, ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মিকোলা কুলেবা, সেভ দ্য চিলড্রেন, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষাকারী সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস এবং দুটি আন্তর্জাতিক আদালত।
শান্তি পুরস্কারের অন্যতম পূর্বাভাসদাতা হাকন গেরলোভ মনে করেন, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন হতে পারে ব্যতিক্রমী পছন্দ। তার মতে, বিভিন্ন দেশের যৌথভাবে পরিচালিত এই মহাকাশ স্টেশন এমন এক সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতীক, যখন বিশ্বের অনেক দেশ নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ব্যাপক আলোচনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য তিনি। তবে ২০২৬ সালের পুরস্কারটি তিনি পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন তিনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, নোবেল কমিটি এবার কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা তিনি জানেন না। তার ভাষ্য, কমিটির এমন একটি ‘সুনাম’ রয়েছে যে তার মতো ব্যক্তিদের হয়তো তারা পুরস্কার দিতে চায় না।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে শান্তি, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা রক্ষার এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠছে কাঙ্ক্ষিত এই পুরস্কার, এখন নরওয়ের অসলোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
সূত্র: টাইম ও এবিসি