খামেনির জানাজায় যাওয়া বিমানে বাঁধার পরিণিত ভোগ করছে সৌদি!

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া হুথি প্রতিনিধিদলকে বহনকারী বিমান ঘিরে জুলাইয়ে ইয়েমেনে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তার রেশ এখন সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের সংঘাতেও আলোচনায় আসছে। তবে সৌদি বাদশাহ নিজে বিমান আটকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, চলতি অক্টোবর মাসে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হুথিদের হামলা নতুন করে নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ অক্টোবরের হামলায় ১৩ জন নিহত হন। পরে ১৩ অক্টোবর সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর ধাহরান সদর দপ্তরেও হামলার ঘটনা ঘটে।

খামেনির জানাজার বিমান নিয়ে কী ঘটেছিল?
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন। তার জানাজা ও স্মরণানুষ্ঠান জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইয়েমেনের হুথি প্রতিনিধিদল ইরানে যায়। ৪ জুলাই রয়টার্স  জানায়- হুথিরা অভিযোগ করেছিল, খামেনির জানাজায় অংশ নিতে যাওয়া প্রতিনিধিদলকে বহনকারী একটি ইরানি বেসামরিক বিমানকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে সৌদি যুদ্ধবিমান। হুথিরা তখন সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার হুমকিও দিয়েছিল। 

এরপর ১৩ জুলাই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস এবং আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়- ইরান থেকে হুথি প্রতিনিধিদলকে ফিরিয়ে আনা একটি বিমান সানার বিমানবন্দরে অবতরণের আগেই রানওয়েতে হামলা চালানো হয়। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, ইরানি বিমানটির অবতরণ ঠেকাতেই রানওয়েতে হামলা করা হয়েছিল। হুথিরা এ হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে। তাদের দাবি, বিমানটি পরে হোদেইদা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। 

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা হয়েছিল ইয়েমেনের ভেতরে। সৌদি বাদশাহ সালমান ব্যক্তিগতভাবে বিমান আটকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেনএমন কোনো নিশ্চিত তথ্য এসব প্রতিবেদনে নেই।

কেন সৌদি আরবের ওপর হামলা বাড়াচ্ছে হুথিরা?
হুথি আন্দোলন ইয়েমেনের একটি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে সৌদি আরব ২০১৫ সালে দেশটির গৃহযুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি।

রয়টার্সের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার ঘোষিত কারণ হলো ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সামরিক অভিযান। হুথিরা সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোকে নিজেদের পাল্টা হামলার লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান, বেসামরিক নাগরিক ও কর্মীদেরও এসব স্থাপনা থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা, ইয়েমেনে সৌদি সামরিক তৎপরতা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।

সৌদি আরবের জন্য কেন পরিস্থিতি গুরুতর?
সৌদি আরবের অর্থনীতি তেল উৎপাদন, রপ্তানি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বিমান যোগাযোগের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা শুধু নিরাপত্তার জন্য নয়, অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদি আরবগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে। ধাহরানে আরামকোর সদর দপ্তরে হামলার পরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু ছিল বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে; সৌদি কর্তৃপক্ষ আগুনের ক্ষয়ক্ষতিকে সীমিত বলে বর্ণনা করেছে। 

এসব ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিমান চলাচল এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু খামেনির জানাজায় যাওয়া বিমান ঘিরে সংঘাতের ফল বলা যাবে না। সাম্প্রতিক হামলার পেছনে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, সৌদি সামরিক অভিযান এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত একাধিক কারণ রয়েছে।

বাদশাহর সিদ্ধান্তই কি সৌদির বর্তমান সংকটের কারণ?
এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার মতো প্রমাণ নেই। খামেনির জানাজায় যাওয়া বিমান ঘিরে জুলাইয়ে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছিল এবং হুথিরা তখন সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু অক্টোবরের হামলাগুলোর ঘোষিত কারণ হিসেবে হুথিরা ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর অভিযানকে উল্লেখ করেছে।

অতএব, জানাজার বিমান ঘিরে সংঘাতকে বর্তমান সংকটের একটি পূর্ববর্তী ঘটনা হিসেবে দেখা যায়; কিন্তু সৌদি বাদশাহর কোনো একক সিদ্ধান্তের কারণে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের গতিপথ নির্ভর করবে সৌদি আরব, হুথি গোষ্ঠী, ইয়েমেনের সরকার এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস