ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না এবং দেশটিতে স্থলসেনা পাঠানোর প্রয়োজন দেখছেন না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই ঘোষণাকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং তাঁর বক্তব্যে পারমাণবিক অস্ত্রের পরিবর্তে প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার, সীমিত সামরিক অভিযান এবং আলোচনার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনাই সামনে এসেছে।
১৬ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। একই সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের একটি সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় নতুন হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তবে সেখানে স্থলসেনা পাঠানোর প্রয়োজন দেখছেন না বলে জানান তিনি।
পারমাণবিক অস্ত্র নয়, প্রচলিত অস্ত্রেই লক্ষ্য অর্জনের দাবি
ট্রাম্পের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র রয়েছে, যা ব্যবহার করেই সামরিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
সাক্ষাৎকারে তিনি ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত বিশাল প্রচলিত বোমার প্রসঙ্গ তোলেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের সবচেয়ে বড় প্রচলিত বোমাগুলোর একটি; পারমাণবিক অস্ত্র নয়।
এখানে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার ঘোষণা মানে সামরিক হামলা থেকে সরে আসা নয়। প্রচলিত অস্ত্র দিয়েও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো সম্ভব। ট্রাম্প একই সাক্ষাৎকারে ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামে পরিচিত সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
স্থলসেনা পাঠানোর ঝুঁকি কতটা?
ইরানের মতো বিস্তৃত ভূখণ্ড ও সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশে স্থলসেনা পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে। বিমান হামলার তুলনায় স্থল অভিযান দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এতে সেনাসদস্যদের হতাহত হওয়ার আশঙ্কা, রসদ সরবরাহের জটিলতা এবং যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রশ্নও সামনে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থলসেনা ইরানে পাঠানোর প্রয়োজন নেই—ট্রাম্পের বক্তব্যে এই অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তবে কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত সামরিক ব্যাখ্যা দেননি। তাই স্থল অভিযানের ঝুঁকি ও ব্যয়কে তাঁর অবস্থানের সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা যায়, নিশ্চিতভাবে ঘোষিত কারণ হিসেবে নয়।
এর আগে মার্চে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ন্ত্রণে নিতে মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার সময়ও ট্রাম্প বলেছিলেন, এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র তখনো সেই সিদ্ধান্তের কাছাকাছি পৌঁছায়নি। অর্থাৎ স্থলসেনা পাঠানোর প্রশ্নটি তাঁর প্রশাসনের সামনে আগেও এসেছে।
কূটনৈতিক আলোচনা কি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ৮ অক্টোবর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে হামলা চালাবে না। তিনি ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলার কথাও জানিয়েছিলেন।
এপি জানায়, এর আগে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী সমঝোতার কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ এবং নতুন করে সামরিক তৎপরতার কারণে তা ভেঙে পড়ে। ফলে আলোচনা চললেও সংকটের স্থায়ী সমাধান তখনো নিশ্চিত ছিল না।
১৬ অক্টোবরের বক্তব্যেও ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে বা সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তেলের দাম ও নির্বাচনী চাপের বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে।
এপির ১০ অক্টোবরের বিশ্লেষণে বলা হয়, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় বিষয়টি ট্রাম্পের রাজনৈতিক দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ট্রাম্প ও ইরানের নেতারা নির্বাচনী সময়সূচি তাদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করছে—এমন বক্তব্য অস্বীকার করেছেন।
সুতরাং তেলের দাম ও নির্বাচনী চাপকে সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচনা করা যায়; কিন্তু ট্রাম্প কেবল এই কারণেই পারমাণবিক অস্ত্র বা স্থলসেনা ব্যবহারের পথ থেকে সরে এসেছেন, এমন প্রমাণ প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে নেই।
তাহলে কি ইরানে নতুন হামলার আশঙ্কা কমেছে?
ট্রাম্পের বক্তব্যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার ও স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ হলেও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন প্রচলিত হামলার সম্ভাবনা খোলা রয়েছে। রয়টার্সের ১৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিএনএনের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। রয়টার্স বলেছে, তারা ওই প্রতিবেদনটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এ কারণে বর্তমান অবস্থাকে সামরিক অভিযান থেকে সম্পূর্ণ সরে আসা না বলে অস্ত্রের ধরন ও অভিযানের পদ্ধতি নিয়ে সীমারেখা টানার চেষ্টা হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নেবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের আলোচনা, সামরিক পরিস্থিতি এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প কেন ‘পিছিয়ে গেলেন’—তার একক ও নিশ্চিত কারণ এখনো প্রকাশিত হয়নি। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন নেই বলে তাঁর দাবি, স্থল অভিযান এড়িয়ে চলার অবস্থান, ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা এবং জ্বালানি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে তাঁর সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট বোঝা যায়। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই।