সৌদি আরবের একটি ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। ব্রিটেনের কাছ থেকে সৌদি আরবের কেনা যুদ্ধবিমানটি হামলায় ধ্বংস হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হুথিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি যুদ্ধবিমানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো একটি বস্তু ছুটে যাওয়ার পর সেটিতে আগুন জ্বলছে। তবে ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বিমানটি ধ্বংস হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি।
ব্রিটেনের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের সামরিক অস্ত্র বাণিজ্যের অংশ হিসেবে দেশটি ৭২টি ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান কিনেছে। ‘প্রজেক্ট সালাম’ নামের ওই চুক্তির মূল্য ছিল ৪৪৩ কোটি পাউন্ড। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবকে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে আসছে লন্ডন।
লন্ডনের ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক স্টিভেন ওয়াগনার বলেন, ভিডিওতে থাকা যুদ্ধবিমানটিকে ইউরোফাইটার টাইফুন বলে মনে হলেও সেটি ধ্বংস হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তাঁর মতে, পাইলট কৌশলীভাবে বিমান চালিয়ে এবং প্রতিরক্ষামূলক ফ্লেয়ার ব্যবহার করে হামলা এড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
ওয়াগনারের ধারণা, বিমানটিকে লক্ষ্য করে ইরানের তৈরি কোনো প্রচলিত ভ্রাম্যমাণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে ব্যবস্থাটি কত দিন ধরে সেখানে সক্রিয় রয়েছে এবং সামরিক অবরোধের আগে নাকি পরে সেখানে পৌঁছেছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তিনি বলেন, এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা হঠাৎ সক্রিয় হয়ে হামলা চালিয়ে টাইফুনের মতো চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানকে বিপদে ফেলতে পারে। রাডার শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে এসব ব্যবস্থা অল্প সময়ের জন্য চালু করা হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে।
তাঁর মতে, এফ-৩৫-এর মতো স্টেলথ প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান এসব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তুলনামূলক নিরাপদ হলেও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। তবে একটি বিমান হারানোর দাবি থেকে সৌদি আরব নিজেদের প্রতিরক্ষা দিতে অক্ষম—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। সময়ের সঙ্গে উভয় পক্ষই কৌশল পরিবর্তন করবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডের নেতৃত্বে সরকারপন্থী বাহিনীর সঙ্গে হুথিদের লড়াই চলছে।
সংঘাতের বড় ধরনের বিস্তার ঘটিয়ে হুথিরা প্রথমবারের মতো ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনের আল-মাশিক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, এতে দুই নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা অক্ষত রয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে হত্যাচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এ হামলার পর ইয়েমেনে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে। সংঘাতে সৌদি আরবের বাইরের শক্তিগুলোও জড়িয়ে পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির বাসিন্দারা। হুথিদের মোকাবিলায় অন্য মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য হুথিদের হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে দেশটি।
বৃহস্পতিবার হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের অধিকাংশ আকাশসীমা ও বিমানবন্দরকে ‘অনিরাপদ’ ঘোষণা করেন। তবে মক্কা ও মদিনার পবিত্র আকাশসীমাকে এর বাইরে রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি এক সংবাদ সম্মেলনে হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, হামলাকারী ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহারের অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, আঞ্চলিক পক্ষগুলোর সহায়তায় এসব প্রযুক্তি পেয়েছে হুথিরা।
আল-মালিকি আরও দাবি করেন, ৭ থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় ১৭ জন নিহত ও ৩৩৩ জন আহত হয়েছেন। ১ অক্টোবর থেকে বিমানবন্দরটিতে ২০ বার হামলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সৌদি সমর্থিত বাহিনী জানিয়েছে, বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা পুনর্দখলে ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান চালানো হচ্ছে। তাদের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় হুথিদের লক্ষ্য করে ১ হাজার ২৫০টি হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান ও রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে তাইজ প্রদেশের উপকূলীয় শহর ধুবাবের বিমানঘাঁটিতে হুথিদের হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারপন্থী বাহিনী। হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্স জানিয়েছে, সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডের সঙ্গে তারা বিমানঘাঁটিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। একই সময়ে সরকারপন্থী বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং ধুবাব জেলার বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের সঙ্গে লড়াই করছে।
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে জনস্বাস্থ্যেও। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ইসলামিক রিলিফ সতর্ক করে বলেছে, গত তিন সপ্তাহে দক্ষিণ ইয়েমেনে কলেরার সংক্রমণ তিন গুণ বেড়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষ বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত স্যানিটেশন-সুবিধা ছাড়াই গাদাগাদি করে শিবিরগুলোতে বসবাস করায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
সংস্থাটির হিসাবে, প্রায় দুই লাখ মানুষ অতিরিক্ত ভিড় ও দূষিত পরিবেশের মধ্যে থাকা শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ