ইয়েমেনের হুথিদের সৌদি আরবে হামলায় উৎসাহ দেওয়ার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে রিয়াদ। সৌদি আরবের দাবি, হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা ২০২৩ সালে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে করা চুক্তির শর্তের পরিপন্থী। ইয়েমেনের সংঘাত ঘিরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি বলেন, ‘সংঘাতের এই পর্যায়ে হুথিদের উত্তেজনা বৃদ্ধি ইরানের উৎসাহে হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।’
মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের যুদ্ধ সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে—এ বিষয়ে রিয়াদের পক্ষ থেকে এটি বিরল প্রকাশ্য বক্তব্য।
২০২৩ সালের চুক্তি নিয়ে সৌদির অভিযোগ
২০২৩ সালের মার্চে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তিতে পৌঁছায়। এর আওতায় দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবেও বিবেচিত হয়েছিল।
ক্রিমলির অভিযোগ, হুথিদের অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও সমর্থন দিয়ে ইরান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব এবং বেইজিং চুক্তির প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করছে।
চুক্তিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সমঝোতায় ইয়েমেনে জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির পক্ষে হুথিদের সংযত রাখতে তেহরানের ভূমিকার প্রত্যাশা ছিল বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়।
তবে সৌদি আরবের এসব অভিযোগের বিষয়ে ইরানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় চাপে রিয়াদ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব একাধিক হামলার মুখে পড়েছে। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর করপোরেট সদর দপ্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও চাপে পড়েছে।
তবে উত্তেজনা বাড়লেও তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে রিয়াদ। চলতি সপ্তাহে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এর আগে চলতি মাসে তেহরানে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আরাগচির বোনের জানাজায় অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ইয়েমেনের সংঘাতের পুরোনো পটভূমি
২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। সে সময় সৌদি আরবের বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ইয়েমেনের সংঘাত দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করে, যেটিকে জাতিসংঘ বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছে।
২০২২ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুথিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর ফলে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যদিও সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সৌদি আরবের অভিযোগ, গত জুলাইয়ে সানার বিমানবন্দরে হামলার পর পরিস্থিতি আবার অবনতির দিকে যায়। হুথি কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি বিমান অবতরণ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে সৌদি আরব ওই হামলা চালিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর হুথিরা সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করে এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় অভিযান জোরদার করে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, হুথিরা সৌদি আরবের দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এসব হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরব ও তাদের ইয়েমেনি মিত্ররা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা
২০২৩ সালের চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব ও ইরান দীর্ঘদিনের বৈরিতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ইয়েমেনের সংঘাত এবং সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের হামলা সেই সম্পর্কের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
একদিকে রিয়াদ তেহরানের বিরুদ্ধে হুথিদের সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে সামরিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক সংলাপ—দুই ধারার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে সৌদি-ইরান সম্পর্ক।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই