যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, হুমকির মুখে ইরান সার্বভৌম অধিকার ছাড়বে না: আরাঘচি

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, হুমকি ও ভয়ভীতির মুখে ইরান তার সার্বভৌম অধিকার ছেড়ে দেবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তার ভিত্তিতে সংলাপের জন্য তেহরান প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৫২তম কাউন্সিলের বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে আরাঘচি এসব কথা বলেন। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সি তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

আরাঘচি বলেন, ইরান জবরদস্তি, হুমকি কিংবা ভয় দেখানোর নীতি মেনে নেবে না। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আঞ্চলিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং রাজনৈতিক সমাধান ও সংলাপের পথ খোলা রাখতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের অভিযোগ

বক্তব্যে আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানে হামলা, হত্যাকাণ্ড ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, গত দুই বছরে ইরান কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করলেও ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপ ও হুমকির পথ বেছে নিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, সংঘাতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছেন। মিনাব শহরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মৃত্যু, লামার্দের একটি স্টেডিয়ামে ক্লাস্টার বোমা হামলা এবং কেশম দ্বীপের একটি লবণমুক্তকরণ স্থাপনায় হামলার ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি।

তবে এসব হতাহতের সংখ্যা ও হামলার বিষয়ে আরাঘচির বক্তব্যকে ইরান সরকারের দাবি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার বক্তব্যে উল্লেখিত প্রতিটি ঘটনা ও সংখ্যার স্বাধীন যাচাইয়ের বিস্তারিত দেওয়া হয়নি। আরাঘচি বলেন, ইরান তার জনগণ, সার্বভৌমত্ব ও বৈধ স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা করবে। একই সঙ্গে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানানোর কথা বলেন।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে সাত দিনের প্রস্তাব

বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টি তুলে ধরেন আরাঘচি। তার দাবি- ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে প্রণালিটি উন্মুক্ত ছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে সামুদ্রিক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। আরাঘচি জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং কাতারের সমর্থনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ১৭ জুন ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সমঝোতার আওতায় জাহাজের নিরাপদ চলাচল সহজ করার বিষয়ে ইরান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করে। এ নিয়ে ওমানের সঙ্গে কারিগরি আলোচনাও শুরু হয়েছিল।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, সমঝোতার পর দুই সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল যুদ্ধপূর্ব মাত্রার প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপ ও সামরিক তৎপরতার কারণে সমঝোতা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি আরও বলেন, কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দিনের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছে ইরান। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিয়ে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে দাবি করেন তিনি। তবে প্রস্তাবটির পূর্ণ শর্ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কিংবা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সম্পর্কে বক্তব্যে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়নি।

ফিলিস্তিন ও ইয়েমেন নিয়েও বক্তব্য

ফিলিস্তিন ইস্যুকে ইসলামি বিশ্বের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে আরাঘচি গাজায় বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা ও অবরোধ চালানোর অভিযোগ তোলেন এবং গাজায় নিহতদের স্মরণে একটি দিবস ঘোষণার প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানান।

ইয়েমেন প্রসঙ্গে তিনি দেশটির সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের প্রতিও সমর্থন জানান। তার মতে, ইয়েমেন সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য সামরিক উত্তেজনা নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

আরাঘচি বলেন, কোনো দেশ অন্য দেশের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের উদ্যোগেই হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বক্তব্যের শেষাংশে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন, চাপের মুখে তেহরান তার সার্বভৌম অধিকার ত্যাগ করবে না। তবে পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা হলে সংলাপের দরজা খোলা থাকবে।