ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী বিতর্কে লুলা-বলসোনারোর বাকযুদ্ধ

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা ভোটের এক সপ্তাহ আগে প্রথম টেলিভিশন বিতর্কে তীব্র বাক্যযুদ্ধে জড়িয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। দুর্নীতি, জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিতর্কে দুজনই একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন। একাধিকবার একে অপরকে মিথ্যাবাদী বলেও আক্রমণ করেন তারা।

রোববারের (১৯ অক্টোবর) এই বিতর্কে লুলা তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে অভ্যাসগত মিথ্যাবাদী ও দুর্বৃত্ত বলে আখ্যা দেন। ফ্লাভিওর কথিত অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের ইঙ্গিত করে তাকে মিলিশিয়াদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেও অভিযোগ করেন লুলা। মঞ্চে তিনি ফ্লাভিওর কাছ থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখেন।

জবাবে ফ্লাভিও বলেন, লুলার কাছ থেকে দূরে থাকাই ভালো, কারণ তার মানিব্যাগ চুরি হয়ে যেতে পারে। ৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে। বিতর্ক চলাকালে তাকে লুলার পেছনে হাঁটাহাঁটি করতে, মাথা নাড়তে এবং লুলার বক্তব্যের সময় ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা যায়।

৮০ বছর বয়সী লুলা চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন। বিতর্কে তিনি জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির তদন্তের বিষয়ে ফ্লাভিওর কাছে ব্যাখ্যা চান। তবে এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে যান ফ্লাভিও। পাল্টা আক্রমণে তিনি লুলাকে ভাঁড় বলে কটাক্ষ করেন এবং প্রেসিডেন্টের এক ছেলের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আনেন। ২০২২ সালের নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা-সংক্রান্ত মামলায় ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো। তিনি বর্তমানে গৃহবন্দী রয়েছেন। ওই নির্বাচনে তিনি লুলার কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি ব্যয় নিয়ে বিতর্ক

বিতর্কে ব্রাজিলের মানুষের প্রধান উদ্বেগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে লুলাকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন ফ্লাভিও। পুনর্নির্বাচিত হতে লুলা বেপরোয়াভাবে সরকারি অর্থ ব্যয় করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে লুলার ঘোষিত বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিরও সমালোচনা করেন ফ্লাভিও।

জবাবে লুলা জানতে চান, আর্জেন্টিনার ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের মতো কঠোর সরকারি ব্যয় সংকোচনের নীতি অনুসরণ করার পরিকল্পনা ফ্লাভিওর আছে কি-না। তবে ফ্লাভিও এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় তার বাবার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ফ্লাভিও স্বীকার করেন, জইর বলসোনারোর প্রেসিডেন্সিতে এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ভুল স্বীকার করার কথাও বলেন তিনি।

লুলা তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে অসচেতন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ফ্লাভিও কখনো দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহার করেননি, এমনকি বাসেও চড়েননি। লুলার ভাষ্য, তার প্রতিদ্বন্দ্বী বাস সম্পর্কে শুধু বই থেকেই জানেন। তিনি কখনো বাসে ওঠেননি এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবন সম্পর্কেও তার ধারণা নেই।

দুই প্রার্থীর পক্ষে সমর্থকদের সমাবেশ

রোববারের বিতর্কের আগে দুই প্রার্থীর সমর্থকেরা দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করে নিজেদের সমর্থন জানান। সাও পাওলোর আর্থিক কেন্দ্র পাওলিস্তা অ্যাভিনিউয়ে হলুদ, সবুজ ও নীল রঙের ব্রাজিলের জাতীয় পতাকার রঙে সজ্জিত পোশাক পরে জড়ো হন বলসোনারোর সমর্থকেরা। সেখানে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন ফ্লাভিও।

অন্যদিকে, লুলার দল ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতীকী রং লাল পোশাক পরে রাজধানী ব্রাসিলিয়ার সরকারি ভবনসংলগ্ন চত্বরে সমবেত হন তার সমর্থকেরা। রিও ডি জেনেইরোতেও শিক্ষার্থীরা বলসোনারোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। ব্রাসিলিয়ার সমাবেশে লুলার সমর্থক সোনিয়া মারিয়া বলেন, বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রাখা প্রয়োজন। অন্য সরকার ক্ষমতায় এলে তাঁদের জন্য পরিস্থিতি খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, সাও পাওলোতে বলসোনারোর সমর্থক ভেরা দে সুজা বলেন, তিনি অপরাধীদের পছন্দ করেন না এবং লুলাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চান।

অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্তের আবেদন

রোববার ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ দেশটির সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্ত শুরুর আবেদন জানায়। তার ঘনিষ্ঠ এক আইনজীবীকে ঘিরে এই অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সাবেক ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়েও তদন্তের মুখে রয়েছেন ফ্লাভিও। সাবেক এই ব্যাংকার জইর বলসোনারোর জীবন নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রে অর্থায়ন করেছিলেন।

অন্যদিকে, দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ৫৮০ দিন কারাগারে ছিলেন লুলা। পরে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ড বাতিল করা হয়।

দ্বিতীয় দফার ভোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

আগামী ২৫ অক্টোবর ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জনমত জরিপে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে লুলার চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ পয়েন্ট বেশি ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন ফ্লাভিও বলসোনারো। প্রথম দফায় ভোট দিতে যাননি প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটার, যা মোট যোগ্য ভোটারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই ভোটারদের সমর্থন আদায় করতে চান দুই প্রার্থীই।

এর আগে একাধিকবার বিতর্কে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও দুজনই তা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। রোববারের বিতর্কটি ছিল তাদের মধ্যে প্রথম মুখোমুখি নির্বাচনী বিতর্ক। দ্বিতীয় বিতর্কটি ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, দ্বিতীয় দফার ভোটের ঠিক আগে।

সূত্র: আল-জাজিরা