যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট ও রাজনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, আলবেনিয়া, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসে বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।
কয়েকটি দেশে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে ২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তের সঙ্গে ইউরোপের বর্তমান আন্দোলনের তুলনা করছেন অনেকে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি আন্দোলনের মধ্যে কিছু মিল থাকলেও ইউরোপের বিক্ষোভকে একক কোনো বিদ্রোহ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
২০২৬ সালের অক্টোবরে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তরুণেরা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো, বাসাভাড়া বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কোথাও শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন করছেন, কোথাও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন সাধারণ মানুষ। আলবেনিয়ায় আবার সরকারপ্রধানের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।
আরব বসন্তের সময় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এর ফলে তিউনিসিয়াসহ কয়েকটি দেশে ক্ষমতাসীন শাসকদের পতন ঘটে। ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণদের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার মতো কিছু মিল থাকলেও বড় পার্থক্য হলো, ইউরোপের দেশগুলোতে মূলত নির্বাচনী ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। সেখানে অধিকাংশ আন্দোলনকারীর দাবি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থা উৎখাত করা নয়; বরং নীতি পরিবর্তন ও সংস্কার নিশ্চিত করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আলজাজিরাকে বলেন, ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সেখান থেকে আন্দোলন অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে তাঁর মতে, এগুলো একক কোনো আন্দোলন নয়। বরং বিভিন্ন দেশে আলাদাভাবে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলোর মধ্যে শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো কিছু অভিন্ন অসন্তোষ রয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন-কুয়েতি সাংবাদিক আহমেদ এলদিন ইউরোপের বিক্ষোভের সঙ্গে আরব বসন্তের আরও গভীর মিল দেখছেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি তরুণদের ক্ষোভ এই আন্দোলনগুলোর অন্যতম চালিকাশক্তি।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রো খান্নাও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ফ্রান্সের স্কুল, মাদ্রিদের রাজপথ ও আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তরুণেরা প্রায় একই বার্তা দিচ্ছেন—ব্যাপক সম্পদবৈষম্যের এই সময়ে তাঁরা এমন একটি ভবিষ্যৎ চান, যার ওপর আস্থা রাখা যায়।
ফ্রান্সে আন্দোলনের কেন্দ্র, ছড়িয়েছে সংঘর্ষ
ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ফ্রান্স। গত ২১ সেপ্টেম্বর ক্রেতেই শহরের লিসে সাঁত-এক্সুপেরি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ ভবন ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে গাদাগাদি করে ক্লাস করার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন। পরে শ্রমিক সংগঠন ও মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষও এতে যোগ দেন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর দেশটির ১১০টি স্থানে আয়োজিত বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। বেশির ভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিস, মার্সেই, লিমোজসহ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ অক্টোবর প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে প্রশ্ন তোলেন, ফরাসিরা কীভাবে নিজেদের দেশের এমন ক্ষতি করতে পারে?
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে অভিবাসন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ৬ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে অভিবাসনকে দায়ী করেন এবং ইসলাম ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে বলে মন্তব্য করেন। ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেনও কয়েক দশকের অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনকে দায়ী করেন। তবে এসব রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক দাবির সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
ইতালি ও বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
১৬ অক্টোবর ইতালিতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ, সামরিক ব্যয় ও সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। তুরিন ও রোমে কিছু শিক্ষার্থী বিদ্যালয় দখল করে অবস্থান নেন। একই দিন ‘নো মেলোনি ডে’ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের নীতির বিরোধিতা করা হয়।
বার্তা সংস্থা আনসার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন। ইতালির নতুন সরকারি বিধি অনুযায়ী, কিছু শ্রেণিতে অ-ইতালীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্কুলে বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মেলোনি।
১৭ অক্টোবর মিলানে বিক্ষোভের একপর্যায়ে মুখোশধারী কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও রাস্তার পাথরের খণ্ড ছুড়ে মারেন। তাঁরা ব্যারিকেডেও আগুন দেন।
বেলজিয়ামেও শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানো, ফি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়। লিয়েজ শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন কিছু ঘটনাকে সরাসরি সহিংসতা বলে বর্ণনা করেছেন।
স্পেন ও পর্তুগালে আবাসন সংকট নিয়ে ক্ষোভ
স্পেনে তরুণদের অন্যতম বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে বাসাভাড়া ও আবাসনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়। ভাড়া বেড়ে যাওয়ার পর ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা সেপ্টেম্বরে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। পরে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় উচ্ছেদ ও আবাসন নিয়ে জল্পনামূলক বিনিয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরালো হয়।
মাদ্রিদে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিক্ষোভ করেন। একই সঙ্গে আবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো আবাসিক সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ তহবিলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানায়।
প্রতিবেশী পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও ১৭ অক্টোবর বাড়িভাড়া, মজুরি, পেনশন ও জনসেবার মান নিয়ে বড় বিক্ষোভ হয়। এর আগে ১৫ অক্টোবর ভোরে পোর্তো শহরে আবাসনসংকটের প্রতিবাদে গড়ে তোলা একটি শান্তিপূর্ণ শিবির সরিয়ে দেওয়ার সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের মারধর করে বলে অভিযোগ ওঠে। এতে প্রতিবন্ধী এক ব্যক্তিসহ ৩৭ জন আহত হন বলে জানায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি ঘটনাটির তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
আবাসন সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে তরুণদের ওপর। অনেকের পক্ষেই স্বতন্ত্রভাবে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা কঠিন হয়ে উঠেছে। ইউরোস্ট্যাটের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ—অর্থাৎ প্রতি চারজনের একজনের বেশি—অতিরিক্ত মানুষের সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকা বাসায় বসবাস করেছেন।
আলবেনিয়ায় সরকারপ্রধানের পদত্যাগের দাবি
ইউরোপের অন্য দেশগুলোর তুলনায় আলবেনিয়ার আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র আরও স্পষ্ট। সেখানে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগ, বেকারত্ব ও সরকারের প্রতি অসন্তোষ থেকে বিক্ষোভের সূত্রপাত। আন্দোলনকারীদের একটি বড় দাবি প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ।
১৭ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে হাজারো তরুণ বিক্ষোভ করেন। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলা এ আন্দোলনের টানা পঞ্চম দিন ছিল সেদিন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে।
এর আগে থেকেই দুর্নীতির অভিযোগ, বেকারত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিতর্কিত উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ক্ষোভ জমছিল। বিক্ষোভকারীরা সরাসরি রামা সরকারের পদত্যাগ দাবি করলেও প্রধানমন্ত্রী সরে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও বিক্ষোভ ও শিক্ষার্থীদের সংগঠিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে ফ্রান্স, ইতালি বা আলবেনিয়ার তুলনায় এসব দেশে আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা কম।
১৬ অক্টোবর বার্লিনের আন্দ্রেয়াস-গিমনাজিয়ামের প্রবেশপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা চালুর প্রস্তুতির বিরোধিতা এবং শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে তাঁরা এ কর্মসূচি পালন করেন। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতিও সংহতি জানান তাঁরা।
অস্ট্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কমানো ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবনতির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হচ্ছেন। গ্রিসে আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, বাসস্থানের সংকট, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামরিক ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে অসন্তোষ দেখা গেছে।
আলজাজিরাকে অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো বলেন, গ্রিসের শিক্ষার্থীরাও ক্লাস বর্জনের ডাক দিচ্ছেন এবং জার্মানিতে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হচ্ছেন। অস্ট্রিয়াতেও আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
তবে এসব বিক্ষোভকে একক কোনো আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, বিভিন্ন দেশে আলাদাভাবে আন্দোলন চলছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে মানুষের অসন্তোষের কারণ একই রকম।
তাহলে কী ইউরোপে আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি ঘটছে?
ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্কের অন্যতম বিষয় হলো, বিক্ষোভগুলো কি আরব বসন্তের মতো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে? সাংবাদিক আহমেদ এলদিন তাঁর ‘ইউরোপস আরব স্প্রিং’ শীর্ষক প্রবন্ধে ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে বর্তমান আন্দোলনের তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, তরুণদের নেতৃত্ব, অনলাইনে সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ—দুই পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ মিল।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপের সরকারগুলো ট্যাংক ছাড়াও বিভিন্ন উপায়ে আন্দোলন দমন করতে পারে। তাঁর মতে, বিক্ষোভ শুরু করা এক বিষয়, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন।
বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা হ্যারি হ্যালপিনও মনে করেন, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা, দুর্নীতি ও ক্ষমতাসীন অভিজাতদের প্রতি ক্ষোভ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধারাবাহিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্রিটিশ পডকাস্টার পিটার ম্যাককরম্যাকও ইউরোপে আরব বসন্তের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে একটি গবেষণাতেও। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক টিইউআই ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইউরোপের সাতটি দেশের ৮ হাজার ২৪ জন তরুণ অংশ নেন। এতে দেখা যায়, ৫২ শতাংশ তরুণ মনে করেন, তাঁদের প্রজন্মের জীবনযাত্রার মান মা-বাবার প্রজন্মের চেয়ে খারাপ হতে পারে। বিপরীতে, মাত্র ২৫ শতাংশ মনে করেন, তাঁরা আগের প্রজন্মের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকবেন।
বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ফ্রান্সে পুলিশের ভিড় নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। অন্যদিকে, সহিংসতা ও ভাঙচুরের কারণে আন্দোলনকারীদের প্রকৃত দাবি আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার কর্মকর্তারাও অভিবাসন এবং ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
সব মিলিয়ে ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভকে এখনই আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি বলা যাচ্ছে না। কারণ, ২০১১ সালে আরব বসন্তের মুখোমুখি হওয়া দেশগুলোর অনেকগুলোতেই কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ছিল। বিপরীতে, ইউরোপের দেশগুলোতে নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তরুণদের আস্থাহীনতা কতটা বাড়ে, তার ওপরই নির্ভর করতে পারে এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে