ট্রাম্প-জেলেনস্কি কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা—বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কে ক্রমেই টানাপোড়েন বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) জেলেনস্কির সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট কী বলছেন, সে বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ধারণা নেই। একই সঙ্গে ইউক্রেনের পক্ষে আলোচনার দায়িত্ব অন্য কারও হাতে দেওয়ার সময় এসেছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

এর আগে সপ্তাহান্তে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল টার্মিনাল। রাশিয়ার তেল পরিশোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে ট্রাম্পের আহ্বানের পরও কিয়েভের এই অভিযান দুই দেশের অবস্থানের ব্যবধান আরও স্পষ্ট করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেল ও ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপের মধ্যে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটিতে জ্বালানির মূল্যও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

গত সপ্তাহে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প। একই সময়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের তুলনায় জেলেনস্কির সঙ্গে সমঝোতা করা বেশি কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জবাবে রোববার এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ‘যারা খুনি, এমনকি মুখে হাসি নিয়েও—তাদের চেয়ে এমন অংশীদার থাকা ভালো, যারা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে খোলামেলা ও স্পষ্ট।’ তাঁর এই বক্তব্যকে ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্কের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টেও ট্রাম্প অভিযোগ করেন, জেলেনস্কি যুদ্ধের অবসান চান না এবং সম্ভবত কখনোই চাননি।

হোয়াইট হাউসে দুই নেতার উত্তপ্ত বৈঠকের প্রায় ১৮ মাস পর যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্ক আবারও গভীর সংকটের মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলেনস্কি অবশ্য বারবার বলেছেন, ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তিনি শান্তি আলোচনায় রাজি। রোববার মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি। শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।

পরে জেলেনস্কি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নরওয়েতে উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হতে পারে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, শান্তির উদ্যোগ এগিয়ে নিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে শক্তিশালী করে শান্তির পথ সুগম করতে ইউক্রেন নিজেদের পক্ষ থেকে সবকিছু করছে।

সোমবার জেলেনস্কি আরও বলেন, ইউক্রেন কখনোই এই যুদ্ধ চায়নি এবং যুদ্ধের মর্যাদাপূর্ণ সমাপ্তির জন্য অংশীদারদের প্রতিটি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে।

রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সাম্প্রতিক পদক্ষেপও কিয়েভের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন রুশ ডিজেল রপ্তানির সুযোগ দিতে একটি ছাড় দিয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন কংগ্রেসের আরোপ করা ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আওতা থেকে রাশিয়াকে অব্যাহতি দেওয়ার আরেকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের যুক্তি, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা চলছে। তাই মস্কোকে আলোচনার টেবিল থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে—এমন পদক্ষেপ তিনি নিতে চান না।

রোববার এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে জেলেনস্কি বলেন, নিষেধাজ্ঞার এসব ছাড় পুতিনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তাঁর দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া ব্যর্থতার মুখে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ মস্কোকে সুবিধা দিতে পারে।

ইউক্রেন ও ইউরোপের বিভিন্ন মহলে আশঙ্কা বাড়ছে, শান্তিচুক্তিতে পুতিনকে রাজি করাতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়াকে আরও ছাড় দিতে পারে।

জেলেনস্কি একই সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি রাশিয়ার পক্ষ নেয়, তবে তা হবে ‘ঐতিহাসিক ভুল’। তিনি ট্রাম্পকে বিশ্বাস করতে চান এবং রুশ প্রেসিডেন্টের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আশা করেন বলেও জানান।

এদিকে সোমবার পোপ চতুর্দশ লিওর সঙ্গে কথা বলেছেন জেলেনস্কি। ভ্যাটিকান এ তথ্য জানিয়েছে। এর কয়েক দিন আগে পুতিনের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন পোপ। ওই আলোচনায় রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরের ‘গুরুতর মানবিক পরিস্থিতি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, শহরটিতে প্রায় দুই হাজার বেসামরিক মানুষ খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে আটকা পড়ে আছেন।

সব মিলিয়ে যুদ্ধের অবসান নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে। শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এসব বিরোধ কতটা সমাধান করা যায়, তার ওপর।

সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স