ইতালির বিভিন্ন শহরে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে ইরানের মানবাধিকার-বিষয়ক উচ্চ পরিষদ। বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহারের অভিযোগ এবং ধরপাকড়ের ঘটনা খতিয়ে দেখে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করতে ইতালি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিলান, তুরিন ও বোলোনিয়াসহ ইতালির কয়েকটি শহরে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার এবং পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চ পরিষদ।
১৭ থেকে ১৯ অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর উল্লেখ করে পরিষদটি জানায়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাবিতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারীদের কয়েকটি দলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার, কিছু দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটক এবং কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হওয়ার খবরও এসেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
ইরানের মানবাধিকার-বিষয়ক উচ্চ পরিষদ বলেছে, কিছু ব্যক্তির সহিংস আচরণ অন্য বিক্ষোভকারীদের প্রতি অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ বা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো নাগরিকদের অধিকার অপ্রয়োজনীয়ভাবে সীমিত করার বৈধ কারণ হতে পারে না। একই সঙ্গে ব্যক্তি ও জননিরাপত্তার ক্ষতি এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসেরও নিন্দা জানিয়েছে পরিষদটি।
সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের কোনো পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল কি-না, তা মূল্যায়নের জন্য প্রতিটি ঘটনার পরিস্থিতি, হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা, ব্যবহৃত বলপ্রয়োগের মাত্রা এবং তার পরিণতি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা দরকার। বিবৃতিতে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৯ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার স্বীকৃত।
ইতালি এই আন্তর্জাতিক চুক্তির পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র। চুক্তি অনুযায়ী, এসব অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে আইনি ভিত্তি, বৈধ উদ্দেশ্য এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের শর্ত পূরণ করতে হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য ৩৭-এ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সুরক্ষা এবং নির্বিচার বিধিনিষেধ এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহারের তদন্ত দাবি
ইরানের মানবাধিকার-বিষয়ক উচ্চ পরিষদ বলেছে, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামানের মতো সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার নীতি অনুসরণ করেছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের বলপ্রয়োগ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মৌলিক নীতিমালার কথা তুলে ধরেছে পরিষদটি।
ওই নীতিমালায় অহিংস পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, একান্ত প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন বলপ্রয়োগ এবং কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিষদটি ইতালির কর্তৃপক্ষকে বলপ্রয়োগের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়ার এবং অপ্রয়োজনীয় বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে।
অভিযোগ ও তদন্তের ফল আলাদা করে দেখার প্রয়োজন
ইরানের পরিষদের বিবৃতিতে ইতালির পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। তবে সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ বেআইনিভাবে বলপ্রয়োগ করেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে বিক্ষোভে সহিংসতা বা সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগ থাকলেও তার ভিত্তিতে সব বিক্ষোভকারীর অধিকার সীমিত করা যায় না। ঘটনাগুলোর প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে ইতালির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।