ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে দশেরার অনুষ্ঠানে একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে একাধিক গুলি ছুড়ে বিতর্কের মুখে পড়েছেন ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তা অঙ্কিতা শর্মা। ‘লেডি সিংহম’ নামে পরিচিত এই আইপিএস কর্মকর্তার গুলি ছোড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অস্ত্র ব্যবহারের নিরাপত্তা, পুলিশি শৃঙ্খলা ও নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত মঙ্গলবার বিজয়াদশমী উপলক্ষে ছত্তিশগড়ের রাজনন্দগাঁও শহরের পুলিশ লাইনে ঐতিহ্যবাহী ‘শস্ত্র পূজা’ বা অস্ত্রপূজার আয়োজন করা হয়। এ সময় পুলিশের অস্ত্র ও যানবাহনের পূজা করা হয়। অনুষ্ঠানে নীল শাড়ি পরা অঙ্কিতা শর্মাকে একটি একে-৪৭ রাইফেল হাতে নিয়ে অন্তত ১০ রাউন্ড গুলি ছুড়তে দেখা যায়।
ভিডিওতে দেখা যায়, রাইফেলটির সেফটি সুইচ পরিবর্তন করে এবং চার্জিং হ্যান্ডেল টেনে গুলি ছোড়েন তিনি। পরে রাজনন্দগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কীর্তন রাঠোরকেও একই ধরনের রাইফেল দিয়ে গুলি ছুড়তে দেখা যায় আরেকটি ভিডিওতে।
এ ছাড়া মঙ্গলবার ছত্তিশগড়ের রায়পুর, বিলাসপুর, রায়গড়, দুর্গ, কবিরধাম ও বস্তারসহ বিভিন্ন জেলার পুলিশ সদস্যদের অস্ত্রপূজার পর গুলি ছোড়ার ভিডিও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অঙ্কিতা শর্মার গুলি ছোড়ার ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী অরুণ সাও বলেন, সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
নিরাপত্তা ও অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন
অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস কর্মকর্তা আর কে বিজ বলেছেন, সামরিক কাজে ব্যবহৃত অ্যাসল্ট রাইফেল দিয়ে গুলি ছোড়ার ক্ষেত্রে নিরাপদ স্থান নির্বাচন এবং পর্যাপ্ত সতর্কতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে তিনি বলেন, এই ঐতিহ্যের মূল উদ্দেশ্য অস্ত্রের পূজা করা, গুলি ছোড়া নয়। এ ধরনের গুলিবর্ষণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে, তাই তা এড়িয়ে চলা উচিত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আইপিএস কর্মকর্তা পিটিআইকে জানান, ছত্তিশগড়জুড়েই শস্ত্র পূজার সময় ফাঁকা গুলি বা ‘আওয়াজি কার্তুজ’ ছোড়ার প্রচলন রয়েছে। তাঁর দাবি, এ ধরনের অনুষ্ঠানে সাধারণত জীবন্ত গুলি ব্যবহার করা হয় না।
তবে ওই কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, শূন্যে ছোড়া গুলিও আবার নিচে ফিরে আসে এবং আশপাশের মানুষের আহত হওয়ার কারণ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা
অঙ্কিতা শর্মার গুলি ছোড়ার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কেজেএস ধিলোঁ ঘটনাটির সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, অস্ত্র ব্যবহারের নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে মানা হয়নি।
ধিলোঁ অভিযোগ করেন, অস্ত্রটি বিপজ্জনকভাবে পরিচালনা করা হয়েছে এবং আশপাশে থাকা লোকজনকে আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অননুমোদিত পোশাকে ও অননুমোদিত কাজে সার্ভিস রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্রে শেখানো মৌলিক অস্ত্র পরিচালনার নিয়মও অনুসরণ করা হয়নি।
ঘটনাটিকে দায়িত্বহীন ক্ষমতা প্রদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণে নিজের বা অন্যের মৃত্যু কিংবা আহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাই সমালোচনা করেননি। এক আইনজীবী অঙ্কিতা শর্মাকে ‘আধুনিক মা দুর্গা’ হিসেবে উল্লেখ করে নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে তাঁর ছবি ও ঘটনাটিকে তুলে ধরেন।
আইনজীবী এন কে গোস্বামী লেখেন, এই দৃশ্য এমন এক পুরোনো ধারণার অবসানের প্রতীক, যেখানে মনে করা হতো নারীদের শুধু সুরক্ষা দিতে হবে, ক্ষমতায়ন করা যাবে না। তাঁর মতে, নারী ক্ষমতায়ন শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নারীদের শক্তি, দায়িত্ব, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দেওয়ার মধ্যেও এর প্রকাশ ঘটে।
আরেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ঘটনাটিকে দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্য বলে বর্ণনা করেছেন।
ঘটনাটি ঘিরে একদিকে ঐতিহ্য ও নারী ক্ষমতায়নের পক্ষে বক্তব্য এসেছে, অন্যদিকে অস্ত্র পরিচালনার নিরাপত্তাবিধি ও পুলিশি শৃঙ্খলা মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র: এনডিটিভি