শামোন্ডা ভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায় এবং মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে শনাক্ত হয়েছে গবাদিপশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া শামোন্ডা ভাইরাস।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দেশটিতে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তির মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে—এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ডব্লিউএইচও জানায়, তারা ফরাসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে।

শামোন্ডা ভাইরাস কী?

শামোন্ডা ভাইরাস মূলত গবাদিপশুকে আক্রান্ত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালে নাইজেরিয়ায় গরুর শরীরে প্রথম ভাইরাসটি শনাক্ত করা হয়। গরুর মধ্যে সংক্রমণের ঘটনা বেশি দেখা গেলেও ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া ও আলপাকার শরীরেও ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউওএএইচ) তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত প্রাণীর জ্বর, ডায়রিয়া ও দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সংক্রমণের কারণে গর্ভবতী গরুর বাছুরের জন্মগত ত্রুটি দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

ইউরোপে ছড়িয়েছে ভাইরাসটি

শামোন্ডা ভাইরাসের বেশির ভাগ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে আফ্রিকা ও জাপানে। তবে চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের গবাদিপশুর শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। এরপর অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সসহ পশ্চিম ইউরোপের আরও কয়েকটি অঞ্চলের প্রাণীর শরীরেও এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

কীভাবে ছড়ায় শামোন্ডা ভাইরাস?

ভাইরাসটি মূলত কিউলিকয়ডিস (Culicoides) গোত্রের ক্ষুদ্র একধরনের কামড়ানো পোকা বা মিজের মাধ্যমে প্রাণীর শরীরে ছড়ায়। দেখতে অনেকটা ছোট মাছির মতো এই পোকা কামড়ানোর মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে। তবে কোন প্রজাতির পোকা এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে সরাসরি ভাইরাস ছড়ানোর বিষয়টি এখনো জানা যায়নি। তবে গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মা প্রাণী থেকে তার গর্ভস্থ ভ্রূণের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে।

শামোন্ডা ভাইরাস অর্থোবুনিয়াভাইরাস (Orthobunyavirus) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং সিমবু (Simbu) উপগোত্রের সদস্য। এই উপগোত্রে স্ম্যালেনবার্গ ভাইরাসও রয়েছে। ডব্লিউওএএইচ জানিয়েছে, এ ধরনের ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সাধারণত পোকামাকড়ের মৌসুমি উপস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত চক্রে দেখা দেয়। তবে ইউরোপে এর বিস্তারের ধরন ভাইরাসটি দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে—এমন অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে।

মানুষের জন্য ঝুঁকি কতটা?

ফরাসি কর্তৃপক্ষের ধারণা, ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সংক্রমিত কোনো মিজ কামড় দিয়ে থাকতে পারে। তবে কীভাবে তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন। ভাইরাসটি ওই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ ছিল কি না, কিংবা তাঁর মৃত্যুর পেছনে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।

ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (ইসিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি আগে থেকেই গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাঁর বিদ্যমান অসুস্থতার কারণে সাধারণ মানুষের তুলনায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বুনিয়াভাইরাস গোত্রের বিভিন্ন ভাইরাসের মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটানোর সক্ষমতা এক রকম নয়। তাই সংক্রমিত নমুনা নিয়ে পরীক্ষাগারে কাজ করার সময় কী ধরনের জৈবনিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নির্ধারণে নির্দিষ্ট ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি।

নজরদারি ও চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতা

শামোন্ডা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রাণীর তথ্য স্বেচ্ছায় জানাতে দেশগুলোকে উৎসাহিত করে ডব্লিউওএএইচ। তবে এ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হলে তা জানানো বাধ্যতামূলক নয়। প্রাণীর জ্বর, ডায়রিয়া ও দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ অন্য রোগের ক্ষেত্রেও দেখা যেতে পারে। তাই সংক্রমণ নিশ্চিত করতে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা প্রয়োজন।

বর্তমানে শামোন্ডা ভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা টিকা নেই।

সূত্র: সিএনএন