জর্ডানে গির্জায় বন্দুকধারীদের হামলা, নিহত ৭

জর্ডানের কারাক গভর্নরেটের হামুদ গ্রামে একটি গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলাকালে বন্দুকধারীদের হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩৪ জন।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে জর্ডানের জননিরাপত্তা অধিদপ্তরের পরিচালক ওবাইদুল্লাহ আল-মায়েতাহ এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, হামলায় সাতজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে ২৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

হামলাকারীদের ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন আল-মায়েতাহ। তিনি বলেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হবে এবং এ ঘটনায় জর্ডানের জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া হবে না।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর মুখোশধারী কয়েকজন হামলাকারী গির্জার ভেতরে ঢুকে কয়েক মিনিট ধরে গুলি চালায়।

জর্ডানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আল-মামলাকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে। একটি গাড়ি থেকে নেমে গুলি চালানো দুই সন্দেহভাজনকে ধরতে অভিযান চালাচ্ছে তারা।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া খালেদ বুরকান আল-মামলাকাকে বলেন, সেখানে বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন। হামলাকারীদের একজনের হাতে পিস্তল এবং অন্যজনের হাতে রাইফেল ছিল।

এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন এ হামলার দায় স্বীকার করেনি।

সংবাদ সম্মেলনে জর্ডানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাজেন আল-ফারায়া হামলাটিকে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের নাম উল্লেখ করেননি। হামলাকারীদের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশকে সন্ত্রাস ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। জর্ডানের মানুষ আগে কখনো এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগে দেশটির বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, জর্ডানের মানুষের রক্ত অত্যন্ত মূল্যবান। দেশের বিরুদ্ধে কেউ সীমা অতিক্রম করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একে সন্ত্রাসী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে তারা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সব ধরনের সহিংসতার বিরোধিতা করেছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, উপাসনালয়ে হামলা এমনিতেই নিন্দনীয়, আর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় এ ধরনের হামলা বিশেষভাবে জঘন্য।

জর্ডানে এ ধরনের হামলার ঘটনা খুবই বিরল। দেশটির প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ মানুষের মধ্যে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সদস্য প্রায় ৩ লাখ। সংখ্যালঘু হলেও দেশটিতে খ্রিষ্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনুসারীদের আকর্ষণ করে।

কারাকে আগেও প্রাণঘাতী হামলা

জর্ডানের কারাক অঞ্চলে এর আগেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাদের হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও কানাডার এক পর্যটকসহ ১০ জন নিহত হন। ওই সময় হামলাকারীরা ক্রুসেডার আমলের একটি দুর্গে অবস্থান নিয়েছিল। পরে জর্ডানের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হামলাকারীরা নিহত হয়।

রাজধানী আম্মান থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কারাক অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের পাশাপাশি বসবাসের জন্য পরিচিত। *দ্য ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর*-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ সংবাদদাতা টেলর লাক আল-জাজিরাকে বলেন, এ অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সংহতি ও সহাবস্থান নিয়ে গর্ব করেন।

তিনি বলেন, হামলার উদ্দেশ্য যদি সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি করা হয়ে থাকে, তাহলে এর প্রতিক্রিয়ায় স্থানীয় মানুষের ঐক্য আরও দৃঢ় হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাভিয়ের আবু ঈদ আল-জাজিরাকে বলেন, এ হামলা শুধু জর্ডানের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। জেরুজালেমের মুসলিম ও খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোর অভিভাবকত্বের বিষয়টি জর্ডানের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর ওপর ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করে আসছেন বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। আবু ঈদের মতে, গির্জায় এ হামলা বিশ্বের কাছে জর্ডান যে সহাবস্থান ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরতে চায়, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সূত্র: আল-জাজিরা