৭৫ বছরে একজন কর্মীকেও ছাঁটাই করেনি যে প্রতিষ্ঠান

অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা ব্যবসায়িক সংকট—কোনো পরিস্থিতিতেই গত ৭৫ বছরে কর্মী ছাঁটাই করেনি যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরিভিত্তিক পারিবারিক প্রতিষ্ঠান দ্য গান্ড কোম্পানি। কর্মীদের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কীভাবে ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা বাড়ানো যায়, তা দেখতে প্রতিষ্ঠানটির কারখানা পরিদর্শন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা। এ পর্যন্ত ২০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাদের কার্যক্রম ঘুরে দেখেছেন।

বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় ব্যবহৃত কম্পোজিট উপকরণ তৈরি করে দ্য গান্ড কোম্পানি। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ এখন প্রায় ৪০ কোটি ডলার। কর্মী রয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম *দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল*-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি মুনাফার চেয়ে কর্মীদের সুস্থতা ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়ার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিই প্রতিষ্ঠানটির প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

প্রতিষ্ঠানটির ৫৫ বছর বয়সী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ গান্ড তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি। বড় ভাই রিচ গান্ডের সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। রিচ চেয়ারম্যান ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত এক দশকে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল ১৮ শতাংশ। জেনারেল ইলেকট্রিক ও রকওয়েল অটোমেশনের মতো বড় প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহক।

স্টিভ গান্ডের ভাষায়, কর্মীদের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি শুনতে আবেগনির্ভর মনে হতে পারে, কিন্তু এই পদ্ধতি লাভজনক।

কর্মী ছাঁটাই নয়, সমস্যার সমাধানে গুরুত্ব

ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটে। তবে দ্য গান্ড কোম্পানি সারা বছর কর্মীসংখ্যা তুলনামূলক সীমিত রাখে, যাতে পরিস্থিতি খারাপ হলেও বড় পরিসরে ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন না হয়।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ১২ ধাপের একটি পরিকল্পনা। এর আওতায় কারখানার দেয়ালে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়। কর্মীদের ব্যক্তিগত পেশাগত লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দেওয়া হয় এবং তদারককারীদের নিয়মিত কারখানার উৎপাদন এলাকায় উপস্থিত থাকতে হয়।

কর্মীরা কারখানার কার্যক্রম নিয়ে কোনো সমস্যা বা উদ্বেগ জানাতে লাল রঙের কার্ড ব্যবহার করেন। সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কার্ডটি সেখানে দৃশ্যমান রাখা হয়। ফলে কর্মীদের অভিযোগ বা পরামর্শ উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্টিভ গান্ডের মতে, কর্মীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলে তারা প্রয়োজনীয় মতামত দেন। সেই মতামত অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে কাজের উন্নতি ঘটে। গত ১০ বছরে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার হারও দ্বিগুণ হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

বেতন বৃদ্ধি ও মালিকানায় অংশীদারত্ব

কর্মীদের দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখতে বেতন বৃদ্ধির সুস্পষ্ট কাঠামো রেখেছে দ্য গান্ড কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, অতিরিক্ত সময় কাজের পারিশ্রমিক ও মুনাফা ভাগাভাগির অর্থ বাদেই প্রাথমিক পর্যায়ের কারখানার কর্মীদের গড় বার্ষিক বেতন ৫৫ হাজার থেকে ৬৫ হাজার ডলারের মধ্যে।

কর্মীদের মালিকানায় অংশীদার করার উদ্যোগও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০০৯ সালে চালু হওয়া কর্মী শেয়ার মালিকানা কর্মসূচির মাধ্যমে গত বছর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ মালিকানার অংশীদার হন।

চলতি বছরের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যমান কর্মী শেয়ার মালিকানা কর্মসূচি কিনে নিতে কয়েক কোটি ডলার ব্যয় করে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বিভিন্ন দেশের কর্মীদেরও অন্তর্ভুক্ত করে আরও বিস্তৃত কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেয়। এর আওতায় চীনে কর্মরত কর্মীরাও থাকবেন।

২০ কর্মী থেকে ১ হাজার ৩০০

১৯৫১ সালে সাবেক মিষ্টি বিক্রেতা এড গান্ড প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে স্টিভ ও রিচ গান্ড পূর্ণকালীনভাবে ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি ছিল ২৭ লাখ ডলার। কর্মী ছিলেন মাত্র ২০ জন, যাদের মধ্যে পরিবারের সদস্য ছিলেন নয়জন।

সে সময় প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে থাকা তাদের বাবা পল গান্ড কর্মী ছাঁটাই না করার কঠোর নীতি চালু করেন। তার দৃষ্টিতে, কর্মী ছাঁটাই করা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতারই একটি লক্ষণ।

পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আরও সুসংগঠিত হয়। স্টিভ গান্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ব্যারি-ওয়েমিলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বব চ্যাপম্যানের সঙ্গে আলোচনার পর বর্তমান ব্যবস্থাপনা কৌশলটি সুস্পষ্ট রূপ পায়। এর আগে পরিচালনা পর্ষদ দুই ভাইকে বছরে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল।

চ্যাপম্যানের সঙ্গে আলোচনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গুরুত্ব উঠে আসে। তার বক্তব্য ছিল, গৃহহীন মানুষের সহায়তায় শুধু স্যুপ রান্নাঘরে কাজ করা বা কম্বল বিতরণের বদলে মানুষকে চাকরির সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমেও তাদের পাশে দাঁড়ানো যায়।

কর্মীদের উন্নতির সুযোগ, অন্যদের আগ্রহ

প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি ও পেশাগত উন্নতির সুযোগ কর্মীদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে। এর উদাহরণ ৩৩ বছর বয়সী দেইদ্রা জোনাস। ১৬ বছর আগে সাধারণ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। পরে যন্ত্র পরিচালনা, অভ্যর্থনা ও গ্রাহকসেবার দায়িত্ব পালন করে এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্মীদের মতামত শোনার অধিবেশন পরিচালনা করেন।

জোনাসের মতে, তার নিজের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা তার পরিবারের কেউ আগে কল্পনাও করেননি।

দ্য গান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। ২০০টির বেশি কোম্পানির নেতারা তাদের কারখানা পরিদর্শন করেছেন। ওহাইওভিত্তিক ওয়েলটি এন্টারপ্রাইজেসের প্রধান নির্বাহী ডন টেলরও ছেলে মাইকেলকে সঙ্গে নিয়ে উইসকনসিনে গান্ডের একটি কারখানা ঘুরে দেখেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কিছু পদ্ধতি নিজেদের ব্যবসায় অনুসরণ করতে পারলে ভালো হবে।

কেমব্রিজ এয়ার সলিউশনস নামের একটি শিল্পকারখানার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে গান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। গান্ডের সেন্ট লুইস কারখানা পরিদর্শনের পর তারা নিরাপত্তা ও পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার সমন্বিত ব্যবস্থা চালু করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মেগ ব্রাউনের ভাষ্য অনুযায়ী, গান্ড তাদের এই পদ্ধতি বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ উপকরণও দিয়েছে।

তবে স্টিভ গান্ডের দাবি, অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা তাদের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দেখতে এলেও খুব কম প্রতিষ্ঠানই পুরো ১২ ধাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। অনেক ক্ষেত্রে শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজেরা পরিবর্তনের নেতৃত্ব না দিয়ে দায়িত্ব মানবসম্পদ বিভাগের ওপর ছেড়ে দেন। এতে উদ্যোগটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না।

চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে

কর্মী ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সাফল্য থাকলেও সব সমস্যা কাটেনি। মোট কর্মী চলে যাওয়ার হার ১০ শতাংশের নিচে হলেও নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। দ্রুত ব্যবসা বাড়ার সময় অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার পালায় কর্মী পাওয়া নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয়।

তারপরও কর্মীদের কল্যাণকে ব্যবসার মূল লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান স্টিভ গান্ড। তার মতে, ব্যবসার উদ্দেশ্য শুধু শেয়ারধারীদের মুনাফা বাড়ানো নয়; কর্মীদের যত্ন নেওয়াও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শিল্প উৎপাদনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও এই পদ্ধতি কার্যকর করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তার বক্তব্য, তাদের মতো একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি এমন ব্যবস্থা চালু করতে পারে, তাহলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষেও তা করা সম্ভব।