দুই সেনা নিহতের পর ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল

অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভাঙা ও বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) একটি সামরিক চেকপোস্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর গুলিতে ওই দুই সেনা নিহত হন। এ ঘটনায় আরও তিন সেনা সামান্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।

ঘটনার পর হেবরন শহরে পূর্ণ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও শুক্রবার থেকে পুরো পশ্চিম তীর বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান। তবে পরে তিনি অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে হেবরন ও হালহুল শহর ঘিরে অবরোধ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলেন। প্রয়োজনে এই ব্যবস্থা অন্য এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা হতে পারে।

ইসরায়েলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর প্রথমবারের মতো নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে এই হামলার ঘটনা ঘটল। নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত নেতানিয়াহুর জন্য নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হেবরনে কয়েক দিনের অভিযান

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা (আইএসএ) এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, হেবরন এলাকায় কয়েক দিন ধরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানো হবে। হামলাকারীরা যে এলাকা থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, আপাতত সেখানেই অভিযান সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ওই এলাকায় অস্ত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবকাঠামো খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এলাকাটির বাসিন্দাদের জন্য বের হওয়ার তিনটি নির্ধারিত পথ রাখা হয়েছে। বের হওয়ার সময় তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। কারও আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

অভিযানের অংশ হিসেবে হামলাকারীদের বাড়িঘরের মানচিত্র তৈরি, হেবরন ও হালহুলের নির্দিষ্ট এলাকায় অবরোধ, সড়কে তল্লাশিচৌকি স্থাপন এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে—এমন অবৈধ স্থাপনাও ভেঙে ফেলা হচ্ছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ

শুক্রবার বিকেলের দিকে হেবরনের ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় ভবন ভাঙার কাজ শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। সিএনএনের পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি আবাসিক ভবনের বাসিন্দাদের উদ্দেশে এক ইসরায়েলি সেনা বলছেন, তাঁদের পাঁচ মিনিটের মধ্যে এলাকা ছাড়তে হবে।

নেতানিয়াহু বলেন, হামলাকারীরা যে এলাকা থেকে এসেছিল, সেখানে বাসিন্দাদের সরিয়ে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হবে। অস্ত্র পাওয়া গেলে তা সরিয়ে নেওয়া হবে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে।

এর আগে তিনি জানান, জেনিন, তুলকারেম, নুর শামস ও আল-ফারা শরণার্থীশিবিরে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে যে ধরনের অভিযান চালানো হয়েছিল, হেবরনেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। ওই অভিযানের ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন এবং শরণার্থীশিবিরের পুরো এলাকাজুড়ে বহু মানুষকে বাড়িঘর ছাড়তে হয়েছিল।

ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের পরিকল্পনার নিন্দা

হেবরনের একটি এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেম।

সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইউলি নোভাক বলেন, নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ হেবরনের একটি ফিলিস্তিনি পাড়া খালি করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এটি পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের শরণার্থীশিবিরগুলোতে সংঘটিত ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে।

হামলাকারী দুই বন্দুকধারী নিহত

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, হামলাকারী দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারী শুক্রবারের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলের ভিডিওতে কয়েক মিনিট ধরে গোলাগুলি চলতে দেখা গেছে। রয়টার্সের একটি ভিডিওতে ইসরায়েলি এক উদ্ধারকর্মীকে বলতে শোনা যায়, অন্তত ২০ মিনিট ধরে গুলিবর্ষণ চলছিল এবং আহতদের সরিয়ে নিতে তাঁরা সমস্যায় পড়ছিলেন।

আইডিএফ জানিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। গাড়িটিতে বিপুল পরিমাণ গুলি ও গোলাবারুদ ছিল বলে দাবি করেছে তারা।

ইসরায়েলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেন, এটি ছিল গুরুতর সন্ত্রাসী হামলা। তাঁর দাবি, সেনাদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে আরও বড় হামলা এবং বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গেছে। গাড়িতে থাকা গোলাবারুদ আরও বড় পরিসরের হামলায় ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

জামির জানান, এ ঘটনায় আরও সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হবে। নেতানিয়াহুও এক বিবৃতিতে হামাসের সদস্য ও হামলার নির্দেশদাতাদের খুঁজে বের করার অঙ্গীকার করেন।

হামাস এক বিবৃতিতে হামলার প্রশংসা করলেও এর দায় স্বীকার করেনি। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকোট হামলায় আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।

সূত্র: সিএনএন