আটক অবস্থায় খেতে পারত না কিশোরী, মুক্তির ৫ মাস পর মৃত্যু

জাপানে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ১৮ দিন পুলিশি হেফাজতে রাখার পর মুক্তি দেওয়া হয়। এর পাঁচ মাস পর অপুষ্টিজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়। মেয়েকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার ও আটক রাখার অভিযোগ তুলে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তার মা। ঘটনাটি জাপানে কিশোর সন্দেহভাজনদের আটকের নিয়ম এবং হেফাজতে তাদের অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুনা ছদ্মনামে পরিচিত ওই কিশোরী ২০২৫ সালে জাপানের হিয়োগো প্রিফেকচার পুলিশের হাতে আটক হয়। তার মায়ের পরিচালিত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের একটি পরিচর্যাকেন্দ্রে একজন বাসিন্দাকে আঘাত করার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। তবে রুনার মায়ের দাবি, ওই বাসিন্দা অন্যদের কামড়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে থামাতে রুনা শুধু তার চোয়ালের কাছে হাত রেখেছিল। রুনা অভিযোগ অস্বীকার করে এবং শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি।

রুনার মা ইয়োকোর অভিযোগ, গত বছরের ১৭ জুন পুলিশ পরিচর্যাকেন্দ্র থেকে তার মেয়েকে আটক করে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে তিনি সেখানে ছুটে গেলেও মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাননি। পরে আদালতের অনুমোদনে তদন্তকারীদের আবেদনের ভিত্তিতে রুনার সঙ্গে তার মায়ের সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ করা হয়। পরিচর্যাকেন্দ্রটির মালিক হওয়ায় ইয়োকো প্রমাণ নষ্ট করতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আটক অবস্থায় রুনা তার মাকে দেখতে চেয়ে বারবার নোট লিখেছিল। একটি নোটে সে লিখেছিল, মায়ের রান্না, আদর এবং একসঙ্গে বই পড়া, কেনাকাটা ও গান গাওয়ার মতো দৈনন্দিন মুহূর্তগুলো তার খুব মনে পড়ছে। অন্য একটি নোটে সে লিখেছিল, কোনো অন্যায় না করেও তাকে আটকে রাখা হয়েছে এবং আতঙ্কের কারণে সে খেতে পারছে না।

রুনার আইনজীবী ইয়োশিহিরো মুকাইয়ের ভাষ্য, আটক অবস্থায় রুনা প্রচণ্ড উদ্বেগে ভুগছিল এবং বারবার জানতে চাইত, তার ভবিষ্যৎ কী হবে। আইনজীবীর মাধ্যমে মা জানতে পারেন, মেয়ে ঠিকমতো খাচ্ছে না। তবে খাবারের হিসাব বা নথি চেয়েও তিনি পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

মুক্তির আগের রাতে রুনা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাকে হাসপাতালে নিতে হয় বলে তার মা জানিয়েছেন। পরদিন মেয়েকে দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। ইয়োকোর ভাষ্য, মেয়েটি তখন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল; এমনকি অল্প দূরত্ব হাঁটতেও তার কষ্ট হচ্ছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ের শুরুতে মুক্তি পাওয়ার পর রুনা বড়দের, এমনকি চিকিৎসক ও নার্সদেরও সন্দেহ করতে শুরু করে। তাকে খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। হাসপাতালে যেতে অনীহাও তার চিকিৎসা জটিল করে তোলে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুনার মৃত্যুর কারণ হিসেবে খাদ্যগ্রহণজনিত সমস্যার কারণে সৃষ্ট অপুষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুর সময় তার ওজন ছিল প্রায় ২০ কেজি, যা সাধারণত ছয় বছর বয়সী একটি শিশুর গড় ওজনের কাছাকাছি।

রুনার মা পুলিশের বিরুদ্ধে বেআইনি গ্রেপ্তার ও আটক রাখার অভিযোগে ১০ কোটি ৯০ লাখ ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় সাত লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেছেন। তার অভিযোগ, মেয়েকে দীর্ঘ সময় আটক রাখা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা না পাওয়ার পরিণতিতেই তার মৃত্যু হয়েছে। মামলার শুনানি এ সপ্তাহে শুরু হয়েছে।

ইয়োকো বলেন, পুলিশ ও প্রসিকিউটরদের মানুষের যত্ন নেওয়া এবং নাগরিকদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়ে ভাবতে হবে। আদালতে যেন প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ পায়, সেটিও তার প্রত্যাশা। মামলায় জয়ী হলে রুনা আর বেঁচে না থাকলেও তার জীবন ও অভিজ্ঞতা জাপানের বিচারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

জাপানে কিশোরদের আটক রাখার নিয়ম

জাপানের বিচারব্যবস্থায় সন্দেহভাজনদের দীর্ঘ সময় অভিযোগ গঠন ছাড়াই আটকে রাখার বিষয়ে সমালোচনা রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থাকে অনেক সময় ‘হোস্টেজ জাস্টিস’ বলা হয়। তবে দেশটির কিশোর আইন অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্কদের কারাগারে বা আটক অবস্থায় রাখা উচিত কেবল যখন তা এড়ানো সম্ভব নয়।

আইনজীবী মেগুমি ওয়াদা বলেন, ‘এড়ানো সম্ভব নয়’—এই শর্তের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়। ফলে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি অনুযায়ী এর ব্যাখ্যা দিতে পারে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ২০ বছরের কম বয়সী ছয় হাজারের বেশি সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রায় চার হাজারকে ১৫ দিনের বেশি সময় আটক রাখা হয়।

আইনজীবী ও সাবেক প্রসিকিউটর মিকিও উএহারা রুনার মৃত্যুকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এ ঘটনায় এত দীর্ঘ সময় আটকে রাখার প্রয়োজন ছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

হিয়োগো প্রিফেকচার পুলিশ ব্যক্তিগত মামলার বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এক মুখপাত্র বলেছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন; সেখানে প্রিফেকচারের অবস্থান তুলে ধরা হবে। অন্যদিকে, জাপানের বিচার মন্ত্রণালয় ‘হোস্টেজ জাস্টিস’ নিয়ে ওঠা অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাই উচিদা বলেন, কিশোর-কিশোরীদের প্রাপ্তবয়স্কদের ছোট সংস্করণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। এ বয়সে তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও চিন্তাভাবনার বিকাশ চলতে থাকে, ফলে মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে। তার মতে, মানসিক আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত সমস্যা (পিটিএসডি) হজমপ্রক্রিয়া ও ক্ষুধায় প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর ফলে উল্লেখযোগ্য ওজন হ্রাস ঘটতে পারে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাপানে আটক সন্দেহভাজনদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ, কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ এবং আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জাপানে আটক ৮৫ হাজার ৪০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশকে ১৫ দিনের বেশি পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছিল।

রুনার মা আশা করছেন, মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার এই আইনি লড়াই শুধু তার পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারই আনবে না, বরং জাপানের বিচারব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথও তৈরি করবে।