পাকিস্তানের সঙ্গে মালদ্বীপের ঘনিষ্ঠতা, ভারতের উদ্বেগের কারণ কী?

মালদ্বীপের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। সম্প্রতি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর পাকিস্তান সফরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ২০টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একই সময়ে মালদ্বীপে ভারতের তিনটি নৌযানের উপস্থিতি নতুন করে আঞ্চলিক কৌশলগত সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এনেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত মহাসাগরে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মালদ্বীপের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কীভাবে এগোয়, তা নয়াদিল্লির জন্য নজরে রাখা জরুরি। তবে এখনই পাকিস্তানের সঙ্গে মালদ্বীপের সম্পর্কের এই অগ্রগতিকে ভারতের জন্য বড় কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

গত ২১ অক্টোবর ভারতের নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ জাহাজ আইএনএস তির, আইএনএস সুজাতা এবং ভারতীয় কোস্টগার্ডের জাহাজ আইসিজিএস সারথি মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে পৌঁছায়। ভারতীয় নৌবাহিনীর ফার্স্ট ট্রেনিং স্কোয়াড্রনের অংশ হিসেবে দূরপাল্লার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় জাহাজগুলো সেখানে যায়।

মালদ্বীপের ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের (এমএনডিএফ) কর্মকর্তারা জাহাজগুলোকে স্বাগত জানান। সফরকালে দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক, গিরিফুশি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ বিনিময়, একে অন্যের জাহাজ পরিদর্শন এবং যৌথ কার্যক্রমের আয়োজন রয়েছে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ, পেশাগত সম্পর্ক ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। সামুদ্রিক নজরদারি, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান, মানবিক সহায়তা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রেও এসব যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

পাকিস্তানের সঙ্গে ২০টি সমঝোতা স্মারক

ভারতীয় নৌযানগুলোর মালদ্বীপ সফরের সময়ই প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পাকিস্তান সফর করেন। সফরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, পুলিশি সহযোগিতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে ২০টি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

তবে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলোর বিস্তারিত তথ্য এখনো সীমিত। ফলে এসব সমঝোতার মাধ্যমে মালদ্বীপে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি বাড়বে কিংবা দেশটির কৌশলগত অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আগেভাগে হয়ে যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মালদ্বীপের পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানের সঙ্গে এই যোগাযোগ তারই অংশ।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কও জোরদার করছে মালদ্বীপ

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মুইজ্জু মালদ্বীপের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চীন সফরের সময় দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘সর্বাত্মক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে’ উন্নীত করে। ওই সফরে অবকাঠামো, বাণিজ্য, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ২০টি চুক্তি হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে মুইজ্জুর আরেকটি চীন সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হয়।

চীনের কাছে মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি একটি কৌশলগত অবস্থান। অন্যদিকে মালদ্বীপের জন্য চীন বিনিয়োগ, অর্থায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এর মাধ্যমে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ পায় দ্বীপরাষ্ট্রটি।

তবে চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে মালদ্বীপের সম্পর্ক বাড়লেই ভারতের প্রভাব কমে যাবে, এমন নয়। সম্পর্কের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে সহযোগিতার ধরন ও বাস্তবায়নের ওপর।

ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ মালদ্বীপ?

ভারতের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি এবং ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথের পাশে অবস্থিত মালদ্বীপ। এ কারণে দ্বীপরাষ্ট্রটির সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভারতের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান-মালদ্বীপ নিরাপত্তা সহযোগিতা তখনই ভারতের জন্য উল্লেখযোগ্য কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে, যখন তা কূটনৈতিক ঘোষণার গণ্ডি পেরিয়ে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক প্রশিক্ষণ কিংবা যৌথ অভিযান পরিচালনার পর্যায়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, কতগুলো চুক্তি সই হলো, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো চুক্তিগুলো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হচ্ছে।

মুইজ্জুর নেতৃত্বে মালদ্বীপ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতা জোরদার করতে চাইছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। ছোট দেশগুলোর জন্য বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা অস্বাভাবিক নয়।

মুইজ্জুর আমলে ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্কে টানাপোড়েন

মুইজ্জু ক্ষমতায় আসার পর ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়। বিশেষ করে মালদ্বীপে অবস্থানরত ভারতীয় সামরিক সদস্যদের প্রত্যাহারের দাবিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালে ভারতীয় সামরিক সদস্যদের প্রত্যাহারের বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।

তবে পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল হতে শুরু করে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মালদ্বীপ সফর দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগে নতুন গতি আনতে সহায়তা করে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

ভারতের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য যেন বাস্তব সহযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। ভৌগোলিক নৈকট্য, দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং সংকটের সময় দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। তবে এসব সুবিধা ধরে রাখতে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং মালদ্বীপের নিজস্ব অগ্রাধিকারের প্রতি সংবেদনশীলতাও প্রয়োজন।

ভারতের করণীয় কী?

ভারতের নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ জাহাজগুলোর সফরকে এ প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এটি ভারতের ‘মহাসাগর’ (MAHASAGAR) ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর পূর্ণরূপ ‘Mutual and Holistic Advancement for Security and Growth Across Regions’—অর্থাৎ বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধির জন্য পারস্পরিক ও সামগ্রিক অগ্রগতি।

এ ধরনের সফর দুই দেশের সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ বজায় রাখে, পেশাগত সম্পর্ক শক্তিশালী করে এবং দীর্ঘদিনের সহযোগিতাকে বাস্তব কার্যক্রমে রূপ দিতে সাহায্য করে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে মালদ্বীপের সম্পর্ক বাড়াকে ভারতের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। মালদ্বীপ ভারত, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও নয়াদিল্লির সঙ্গে তার পুরোনো সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে পারে। মূল বিষয় হলো, নতুন চুক্তিগুলো ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আনে কি না।

তাই ভারতের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হবে উদ্বেগ ছড়িয়ে না দিয়ে মালদ্বীপের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানো। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা উন্নয়ন, কোস্টগার্ডের সহযোগিতা এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পাকিস্তান-মালদ্বীপ চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

কারণ, আঞ্চলিক প্রভাব কোনো একটি সফর, চুক্তি কিংবা সংবাদ শিরোনামের মাধ্যমে স্থায়ী হয় না। ধারাবাহিক উপস্থিতি, নির্ভরযোগ্য সহযোগিতা এবং অংশীদার দেশের প্রয়োজনের প্রতি সাড়া দেওয়ার মধ্য দিয়েই তা গড়ে ওঠে। মালদ্বীপ যখন তার কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিধি বাড়াচ্ছে, তখন ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সেখানে উপস্থিত থাকা নয়, বরং নির্ভরযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখা।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে