মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ইরানের রাজধানী তেহরানে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, চলমান সংঘাত এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে সোমবার (২৬ অক্টোবর) এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি ও ইরানি কর্মকর্তারা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপসচিব আলী বাঘেরি কানি জানান, বৈঠকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন অংশ নেবেন। ইরানের পক্ষে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই।
বাঘেরি কানি বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই বৈঠক কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।
সৌদি আরবের জনকূটনীতি বিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলিও বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, চলমান সংকটে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানো, সংলাপ এগিয়ে নেওয়া এবং কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই সফর হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ক্রিমলির ভাষ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার এবং এ লক্ষ্য অর্জনে অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
হুথিদের হামলার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের সৌদি আরবে হামলা জোরদার হওয়ার পর ইরান ও মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের তিন সদস্যদেশের মধ্যে এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের যৌথ যোগাযোগ হতে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করেন। সে সময় তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ইরানের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ওই সফরে ইরানি কর্মকর্তারা মুনিরকে জানান, তেহরানের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কোনো আলোচনা হবে না।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। এর আগে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় জুনে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছিল। তবে কয়েক সপ্তাহ পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবারও লড়াই শুরু হলে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে।
এদিকে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত থাকায় রোববার সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের একটি ঢেউ প্রতিহত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি মাসে সৌদি রাজধানী রিয়াদে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর মন্ত্রীরা জরুরি বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সৌদি আরবে সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত মোতায়েন নিশ্চিত করার বিষয়ে তাঁরা একমত হন।
হুথিদের হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের চাপের মুখে পড়ছে।
কী রয়েছে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত আগস্টে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যদেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে সদস্যদেশগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চুক্তিটি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। অন্যদিকে, তুরস্কের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া গত সপ্তাহে শুরু হয়েছে এবং তা এখনো চলমান।
আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে তেহরানের এই বৈঠক কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আলোচনার অগ্রগতি, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং চলমান সংঘাত প্রশমনে তাঁদের সম্মিলিত পদক্ষেপের ওপর।
সূত্র: আল-জাজিরা