ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের জন্য লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সোমবার (২৬ অক্টোবর) পাঠানো অভিনন্দনবার্তায় তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, লুলার নতুন মেয়াদে তেহরান ও ব্রাসিলিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পেজেশকিয়ানের মতে, এ ধরনের সহযোগিতা উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।
অভিনন্দনবার্তায় পেজেশকিয়ান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনে লুলার সাফল্য কামনা করেন। দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।
রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে জয়ী হন লুলা। তিনি বৈধ ভোটের ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ, অর্থাৎ ছয় কোটির বেশি ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান চার লাখ নয়, বরং ৪০ লাখের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে লুলা চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।
ব্রাজিলে ১৯৮৯ সালে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পুনরায় চালু হওয়ার পর এবারই প্রথম প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা কোনো প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় জয় ছিনিয়ে নিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। লুলার এই জয়কে দেশটির গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও জনসমর্থনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
লুলাকে অভিনন্দন জানালেন লাতিন আমেরিকার নেতারাও
লুলার নির্বাচনী জয়ের পর লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের নেতারাও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁদের বার্তায় গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থনের পাশাপাশি বাণিজ্য, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও আঞ্চলিক সংহতি জোরদারের আগ্রহ উঠে এসেছে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম নির্বাচনের ফলকে গণতন্ত্র ও ব্রাজিলের জনগণের বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানো, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট ইয়ামান্দু ওরসি লুলার সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাকে অভিনন্দন জানান। প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা দুই দেশের আঞ্চলিক সংহতি ও উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজও দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন।
চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত লুলার সঙ্গে কথা বলে অভিনন্দন জানান। দুই দেশের অর্থনৈতিক সংহতি বাড়ানো এবং আঞ্চলিক সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
পেরুর প্রেসিডেন্ট কেইকো ফুজিমোরি ব্রাজিলের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং আমাজন অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে সহযোগিতার আগ্রহ জানিয়েছেন। গায়ানার প্রেসিডেন্ট ইরফান আলি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সংহতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও লুলার জয়ে অভিনন্দন জানিয়ে সার্বভৌমত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক সংহতির ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক ধরে রাখার কথা বলেছে।
মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলেও অভিনন্দন
মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর নেতারাও লুলার জয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট বার্নার্দো আরেভালো ব্রাজিলের নির্বাচনকে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো ব্রাজিলের জনগণ ও লুলাকে অভিনন্দন জানিয়ে দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন। কোস্টারিকা ও বেলিজের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানিয়েছে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট লুইস আবিনাদের লুলাকে নতুন মেয়াদের জন্য অভিনন্দন জানান এবং আরও সমন্বিত ও সমৃদ্ধ লাতিন আমেরিকা গড়তে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা জানান। বাহামার প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ ডেভিস জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ব্রাজিলের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ লুলার জয়কে সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকেও অভিনন্দন
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের মধ্যেও লুলার জয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন কয়েকজন। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ব্রাজিলের শ্রমিকদের অধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে লুলার ভূমিকার প্রশংসা করে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজমের প্রেস দপ্তরও গণতন্ত্র, পরিবেশ সংরক্ষণ ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় অভিন্ন অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরে শুভেচ্ছা জানিয়েছে।
টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি হোয়াকিন কাস্ত্রো ব্রাজিলের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের প্রশংসা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যাশা জানান।
বিভিন্ন দেশের নেতাদের অভিনন্দনবার্তায় ব্রাজিলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সমর্থনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। পেজেশকিয়ানের বার্তায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে ইরান-ব্রাজিল সম্পর্ক সম্প্রসারণের প্রত্যাশা; অন্যদিকে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের নেতারা বাণিজ্য, পরিবেশ, উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সংহতিকে সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। সূত্র: প্রেস টিভি