যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে: পেজেশকিয়ান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তার দাবি, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্নের কারণে শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নয়, বিশ্ব অর্থনীতিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মস্কোয় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামের (জিইসিএফ) অষ্টম শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পেজেশকিয়ানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রেস টিভিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, রাজনৈতিক আলোচনা চলার মধ্যেই দুই পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা সংঘটিত হয়েছে। তার ভাষায়- এ ঘটনা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি দাবি করেন, এসব হামলায় ইরানের জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের সমালোচনা

বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের ওপর নৌ ও আকাশপথে অবরোধ আরোপের সমালোচনা করেন পেজেশকিয়ান। তিনি এসব পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দেন। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশকেও নিজেদের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে চাপ দিচ্ছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতাকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করছে। তার মতে, বিশ্বের প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর উচিত এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। তবে এসব অভিযোগ ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের অংশ। সংশ্লিষ্ট হামলা, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান এখানে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।

জ্বালানি কূটনীতিতে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার আহ্বান

জিইসিএফকে বহুপক্ষীয় গ্যাস কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি মূলত দুটি ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন- জ্বালানি বাজারের ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিশীলতা এবং গ্যাস খাতের প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও বিনিয়োগ।

তার মতে, সদস্য দেশগুলোর উচিত বিদ্যমান সক্ষমতাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করা, গ্যাস বাণিজ্য বাড়ানো এবং উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত পুরো জ্বালানি মূল্যশৃঙ্খলে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা। গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাব কমানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। পেজেশকিয়ান বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফোরামের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

ইরানের গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে দাবি

ইরানকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতধারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের একতরফা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি নিজস্ব সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা বছরে ৩০০ বিলিয়ন ঘনমিটারে উন্নীত করেছে।

তার দাবি, প্রাকৃতিক গ্যাস ইরানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয় এবং দেশটির ৯৫ শতাংশ মানুষ জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক হিসেবে ইরান নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। 

বিনিয়োগের আহ্বান তেহরানের

পেজেশকিয়ান তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ইরানে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথের কাছাকাছি হওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জিইসিএফের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, প্রাকৃতিক গ্যাসের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় গ্যাসের ভূমিকা বাড়াতে সহায়তা করবে।