ইতালির ডোলোমাইটস পর্বতমালায় হিমবাহের বরফ গলে বেরিয়ে এসেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার প্রায় ২৫০টি গোলাবারুদ। পর্বতাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এসব গোলা, মর্টার শেল ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করে সরিয়ে নিয়েছে ইতালীয় সেনাবাহিনী। জলবায়ুর পরিবর্তনে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় শত বছরেরও বেশি সময় ধরে বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা এসব বিস্ফোরক সামনে চলে আসছে।
গত মঙ্গলবার সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইতালীয় সেনাবাহিনীর জুলিয়া আলপাইন ব্রিগেড জানায়, দেশটির ত্রেন্তিনো-আলতো আদিজে অঞ্চলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এসব গোলাবারুদ প্রথমে খুঁজে পান পর্বতারোহী, প্রকৃতিপ্রেমী ও স্থানীয়ভাবে চলাচলকারী ব্যক্তিরা। একটি সড়ক দুর্ঘটনার পরও একটি অবিস্ফোরিত গোলা পাওয়া যায়।
সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে প্রথম অবিস্ফোরিত গোলাটি পাওয়া যায় জুন মাসে। ক্যালডোনাজোর কাছে একটি গাড়ি খাদে পড়ে যাওয়ার পর ঘটনাটি সামনে আসে। গাড়ি পার্ক করার সময় চালক হ্যান্ডব্রেক দিতে ভুলে যাওয়ায় সেটি গড়িয়ে খাদে পড়ে যায়। পরে দমকলকর্মীরা গাড়িটি উদ্ধারের সময় একটি গাছের গোড়ায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ৯০ মিলিমিটারের একটি মর্টার শেল দেখতে পান। পরে বিশেষজ্ঞ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেটি সরিয়ে নেয়।
অন্য গোলাবারুদগুলো ১৯১৫ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত ইতালি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘটিত ‘হোয়াইট ওয়ার’-এর সময়কার। ওই যুদ্ধে ডোলোমাইটসের বরফাচ্ছাদিত পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক তৎপরতা চলেছিল। পরে এসব গোলাবারুদ তুষার ও বরফের নিচে চাপা পড়ে যায়। কোনো কোনোটি শত বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে ছিল।
জুলিয়া আলপাইন ব্রিগেডের দ্বিতীয় ইঞ্জিনিয়ার রেজিমেন্টের বিশেষজ্ঞরা আগস্টের শুরুতে গোলাবারুদ অপসারণের কাজ শুরু করেন। উচ্চ পর্বতাঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান ও সামরিক কার্যক্রমে অভিজ্ঞ এই দলটি দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে অভিযান চালায়। মঙ্গলবার সিএনএনকে ইউনিটটির এক মুখপাত্র জানান, গ্রীষ্মকালীন উদ্ধার অভিযান ১৬ অক্টোবর শেষ হয়েছে।
পর্বতারোহী, পর্যটক ও পাহাড়ে কর্মরত শ্রমিকদের নিয়মিত চলাচলের পথের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রবেশের অনুপযোগী দুর্গম এলাকাতেও এসব গোলাবারুদ পাওয়া গেছে। ফলে সেগুলো সরানোর কাজ ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
সেনাবাহিনী জানায়, দুর্গম এলাকা, উঁচু পাহাড় এবং অত্যন্ত কঠিন ভূপ্রকৃতিতে অভিযান চালাতে উদ্ধারকর্মীদের দক্ষ পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে বিয়েনো এলাকার কাছে চিমা দেল ফ্রাতে পর্বতশৃঙ্গ ও ফোরচেল্লা ফিয়েরোল্লো গিরিপথের মধ্যবর্তী স্থানে ৭৫ মিলিমিটারের বেশ কিছু কামানের গোলা পাওয়া যায়। গোলাবারুদগুলো সরানোর সময় জনপ্রিয় একটি পর্বতারোহণের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কাজ শেষ হওয়ার পর পথটি আবার খুলে দেওয়া হয়।
বরফ গলার সঙ্গে বাড়ছে ঝুঁকি
ইতালির এই পার্বত্য অঞ্চলে প্রতিবছরই প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার গোলাবারুদ বরফ গলে সামনে চলে আসে। তবে সেগুলো সরানোর জন্য বিশেষজ্ঞ দল সাধারণত গ্রীষ্মের শেষ ভাগ ও শরতের শুরুর সময়টুকু কাজে লাগাতে পারে। কারণ, অক্টোবরের শেষ দিকে তুষারপাত শুরু হলে দুর্গম এলাকায় অভিযান চালানো আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
সেনাবাহিনীর মতে, গত কয়েক বছরের অতিরিক্ত গরমে কারে আলতো ও লারেস হিমবাহ দ্রুত সরে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে, যা উদ্ধারকর্মীদের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
২০২৫ সালে শীতকালে তুষারপাত কম হওয়া এবং ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় ত্রেন্তিনো অঞ্চলের হিমবাহ গলার গতি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
এ পরিস্থিতিতে পর্যটক ও স্থানীয় পাহাড়ি বাসিন্দাদের সতর্ক করতে নিরাপত্তা প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে। কোথাও সন্দেহজনক গোলাবারুদ বা বিস্ফোরক চোখে পড়লে তা স্পর্শ বা সরানোর চেষ্টা না করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে। সম্ভব হলে নিরাপদ দূরত্ব থেকে ছবি তুলে পাঠানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
বরফ গলে বেরিয়ে আসা এসব গোলাবারুদ শুধু পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যই নয়, উদ্ধারকর্মীদের জন্যও বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। তাই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সামরিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এগুলো শনাক্ত ও অপসারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ইতালীয় সেনাবাহিনী।
সূত্র: সিএনএন